নির্বাচনী ইশতেহার

‘হামার স্বপ্নের পঞ্চগড় হামরা গড়িমো’ স্বপ্নের পঞ্চগড়-০১ গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রণীত আঞ্চলিক ইশতেহার

সংক্ষিপ্ত ইশতেহার

প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রমে আমরা দক্ষতা উন্নয়নমূলক, কর্মসংস্থানমূলক, বৃত্তিমূলক, দেহ ও মনের সুষ্ঠু বিকাশ উপযোগী, দেশপ্রেম ও উচ্চতর আদর্শ জাগ্রত করে এবং নেতৃত্ব গুণের বিকাশ করে এমন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে চাই আমরা।

আমাদের অঙ্গীকার, আমরা আগামী ৫ বছরের মধ্যে পঞ্চগড়ের সাক্ষরতার হার দেশের গড় সাক্ষরতার হারের (৭৫.৬০ শতাংশ) সমান পর্যায়ে নিয়ে যাবো। প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশা ও বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষদের জন্য নাইট স্কুল চালু করে পড়ালেখার ব্যবস্থা করবো।

আমরা এ অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের জন্য ব্যাপকভিত্তিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ করতে চাই। তরুণদের হস্তশিল্প, চামড়া শিল্প, পোশাক তৈরি, স্ক্রিন প্রিন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের কাজ, মোবাইল-টেলিভিশন-কম্পিউটার-ফ্রিজ মেরামত, উন্নত জাতের পশু পালন, পশু প্রজনন, পশু চিকিৎস্য ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।

এছাড়া গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, কাঠমিস্ত্রী, রাজমিস্ত্রী, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, স্যানিটারি ফিটিংস মিস্ত্রীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের আরও বেশি উপার্জনক্ষম করে তুলতে চাই। তাদের এই দক্ষতা দিয়ে তারা শুধু দেশেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে পারবেন।

আরবী জানা কওমী ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের কল সেন্টারে কাজ করার উপযোগী করে গড়ে তুলবো।

পঞ্চগড়ে একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে।

পঞ্চগড়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন এবং একটা হাইটেক পার্ক গড়ে তুলবো আমরা।

পঞ্চগড়ে প্রচুর পরিমাণে তিল ও পান উৎপন্ন হয় কিন্তু বাজারজাতকরণের সঠিক চ্যানেল না থাকায় কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কৃষকদের এই সমস্যা দূর করতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।

কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিশেষ করে পান, তিল, টমেটো বাড়ির কাছে স্থলবন্দরের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশে রপ্তানি করতে পারেন সে বিষয়ে যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবো আমরা।

পঞ্চগড় সুগার মিলে উৎপাদন বন্ধ থাকায় সরকারে লোকসান কমলেও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় মিলের যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সুগার মিল বন্ধ থাকায় স্থানীয় চাষিরা আখ উৎপাদন করতে পারছেন না। তাই আমরা নতুন করে পঞ্চগড় সুগার মিল চালু করতে চাই।

টমেটো সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে অব্যবস্থার কারণে আমাদের টমেটোচাষীদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। সংরক্ষণের জন্য হিমাগার এবং বাজারজাতের জন্য যথাযথ চ্যানেল তৈরি করবো আমরা।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য কৃষির বহুমুখীকরণ, বীজ সংরক্ষণে বীজব্যাংক, উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল উৎপাদন, কৃষি গবেষণা, কৃষক সংগঠন, কৃষি ঋণ, কৃষি বীমা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ-ভিডিও কন্টেন্ট, প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাজারের সাথে যুক্ত করে দেয়া ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করতে চাই।

এ উপমহাদেশের পর্যটন কেন্দ্র নেপাল, ভুটান ও দার্জিলিং এর সাথে পঞ্চগড়কে যুক্ত করে আমরা গড়ে তুলতে চাই বিশেষ ‘পর্যটন হাব’। প্রতিবছর পঞ্চগড়ে ৫০ হাজার পর্যটককের সমাগম ঘটে। এই সংখ্যাকে আমরা তিনগুণ করতে চাই।

পর্যটকদের জন্য থাকা, খাওয়া, বিনোদনের সুযোগ এবং অবশ্যই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই আমরা। পর্যটকরা যাতে টাকার বিনিময়ে স্থানীয় মানুষের অব্যহৃত ঘরে বা বাড়িতে থাকতে পারে খেতে পারেন এমন পরিবেশ গড়ে তোলা হবে।

সাধারণ পর্যটনের পাশাপাশি পঞ্চগড়ে কৃষিভিত্তিক পর্যটনের কথাও আমরা ভেবেছি। আছে দেশ-বিদেশ থেকে কৃষি বিষয়ের ছাত্র-ছাত্রী, গবেষক এখানে আসবেন, থাকবেন, চাষ পদ্ধতি দেখবেন এবং আমাদের কৃষিভিত্তিক পর্যটনকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিবেন।

পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নেয়া হবে যেন ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন মাত্রা পায়।

বাংলাবান্ধা-ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পরিবহন চলাচল করে। এই মহাসড়কটি পঞ্চগড় শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়ার ফলে প্রায় যানজট লেগে থাকে। তাই বাইপাস সড়ক তৈরির উদ্যোগ নেব। এছাড়াও দ্বিতীয় পঞ্চগড় সেতু নির্মাণের উদ্যোগও নেয়া হবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের সূচনালগ্ন থেকেই আমাদের জেলা একটি ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করে আসছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত স্মার্ট বাংলাদেশ রুপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নেও আমরা রোল মডেল হিসেবে কাজ করে যাব।

পঞ্চগড়ের শতভাগ মানুষ যাতে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, প্রশাসন, উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ-কর্মসংস্থানসহ সব সেক্টরে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা ভোগ করতে পারে সেটি আমরা নিশ্চিত করতে চাই।

আমরা আমাদের তরুণ-তরুণীদের উদীয়মান প্রযুক্তি বিশেষ করে Artificial Intelligence, Robotics, Internet of Things, Data Science, Big Data ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবো।

আমাদের তরুণ-তরুণীদের তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেয়া হবে বিশেষ কর্মসূচি।

টেলিমেডিসিনসহ স্মার্ট বাংলাদেশের স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা এ অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, ‘কেবল নিরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য।’ তাই শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই।

কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসকদের সাথে স্থানীয় তরুণদের যুক্ত করে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা দিতে চাই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা ইত্যাদি বিষয়ে মানুষকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে চাই।

তরুণ প্রজন্ম যে অসাধ্য সাধন করতে পারে সেটা আমরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। আমরা তরুণদের যোগ্যতা, মেধা, শিক্ষা এবং দক্ষতা অনুযায়ী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করবো।

মাদক ও জঙ্গিবাদমুক্ত পঞ্চগড় গড়ে তুলতে আমি পঞ্চগড়ের সচেতন নাগরিক এবং বিশেষভাবে অভিভাবকদের সহযোগিতা চাই।

ছাত্রলীগের কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ সৃজনশীল, সৎ তরুণদের আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত এবং নন্দিত। আমাদের বিশ্বাস, পঞ্চগড়ও একদিন হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সকল অঞ্চলের জন্য আদর্শ এবং অনুকরণীয়। আর এই কাজটি হবে তরুণদের নেতৃত্বে।

আমাদের জাতীয় উন্নয়ন দর্শনের আলোকে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক পঞ্চগড়ে গড়ে তুলতে চাই। নারী, শিশু, বিশেষভাবে সক্ষম, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে চাই।

বিভিন্ন অবকাঠামোতে, রাস্তায়, পরিবহনে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে সেটি আমরা নিশ্চিত করবো। সবার জন্য নিরাপদ পঞ্চগড় গড়ে তুলতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে কাজ করবো।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ এবং সব ধরনের নির্যাতন যেকোনো উপায়ে আমরা বন্ধ করতে চাই।

সারা পৃথিবীতেই আজ জীব বৈচিত্র্য ঝুঁকির মুখে। আমরা এমন কোনো উদ্যোগ বা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করবোনা যার ফলস্বরূপ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে।

মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখি ও অন্যান্য প্রাণী, গাছপালা, খাল-বিল, নদী-নালাসহ সমাজের প্রতিটি উপাদান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশু-পাখি, প্রাণী গাছ-পালা, নদী-নালা ইত্যাদি বিষয়ের দিকেও আমার লক্ষ্য রাখতে চাই।

আমাদের এই অঞ্চলের জনপ্রিয় পাখি হচ্ছে ‘শেখ ফরিদ’। এই পাখি সংরক্ষণ ও বংশ বিস্তারের জন্য আমরা অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে চাই। নদীর ধারে ফলজ গাছ রোপণ করতে এবং জলাধার নির্মাণ করতে চাই যেন এখান থেকে পাখপাখালি খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে।

সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা মানুষকে উদারতা শেখায়, সবার সঙ্গে মিশতে শেখায়, সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার মতো কাজে তাদেরকে উজ্জীবিত করে। আমরা কথা দিচ্ছি, স্কুল, কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমরা সংস্কৃতি (যেমন নাটক, আবৃত্তি, সঙ্গীত, বিতর্ক, অভিনয় ইত্যাদিতে) চর্চা ফিরিয়ে আনবো।

আমাদের স্বপ্নের মানবিক পঞ্চগড়ে থাকবে শিশুকিশোর, তরুণ-তরুণীদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ, মানুষের দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ সুখী মানুষ, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো পরিতৃপ্ত কৃষক, বিশেষভাবে সক্ষম এবং পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বচ্চো সুযোগ-সুবিধাসহ এক অনন্য পঞ্চগড়। চলুন আমরা সকলে মিলে সেই স্বপ্নের পঞ্চগড়-০১ গড়ে তুলি।

জয়বাংলা।

পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার

প্রিয় এলাকাবাসী,
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। সবার প্রথমে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে চাই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির পিতা, বাঙ্গালির আত্নপরিচয়ের ঠিকানা মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ দেয়ার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধূ আমার শিক্ষক, আমার দ্রোণাচার্য। আমি বারবার বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীর’ কাছে ফিরে যাই, সেখান থেকেই শিখি। আমার সকল প্রেরণার উৎস তিনি।

আমি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করতে চাই বাঙ্গালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী ৩০ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা এবং ২ লক্ষাধিক মা ও বোনকে, যাদের ত্যাগের বিনিময়েই আমাদের লাল-সবুজের পতাকা। গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করতে যারা জীবন দিয়েছেন তাঁদেরও আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।

বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের যোগ্য উত্তরাধিকার, লক্ষ লক্ষ মেহনতি মানুষের শেষ ঠিকানা, দেশরত্ন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা’র প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। তিনি আমার মত এক সামান্য কর্মীকে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ আমার জীবন ধন্য করেছেন। তিনি আমার শিক্ষক, তিনি আমার অভিভাবক। বঙ্গবন্ধুর রোপণ করা “সোনার বাংলা” নামের সেদিনের সেই চারাগাছ আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপযুক্ত যত্ন আর পরিচর্যায় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নামের বিশাল বৃক্ষ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অদম্য বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মডেল, বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিস্ময়। তৃতীয় বিশ্বের মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর শেখ হাসিনাই আজ বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রঙ্গিন পোস্টার।

আমি আরও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক মাননীয় উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়’কে। বিশ্বের কাছে তিনি “আর্কিটেক্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ” নামে সর্বাধিক পরিচিত। বদলে যাওয়া এই বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম কারিগর তিনি। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় একজন ‘শিক্ষানবিস’ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করি।

বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং সোনার বাংলা
] “আমার মাটির সঙ্গে, আমার মানুষের সঙ্গে,
আমার কালচারের সঙ্গে, আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে,
আমার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেই
আমার ইকোনমিক সিস্টেম গড়তে হবে।”
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সভায় ভাষণদানকালে এই ঐতিহাসিক বাক্যটি বলেন। খুব সাধারণ একটা বাক্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু অসাধারণভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা সামগ্রিক উন্নয়ন দর্শনটি তুলে ধরেছিলেন। আমাদের উন্নয়ন মডেল কেমন হওয়া উচিত সেটা বহু গবেষক, তাত্ত্বিক, অর্থনীতিবিদ, পরিকল্পনাবিদ যেখানে দিনের পর দিন গলদঘর্ম হয়েছেন সেখানে বঙ্গবন্ধু খুব সাধারণ কিন্তু অসাধারণভাবে সোনার বাংলার উন্নয়নের রূপকল্প তুলে ধরেছেন। দেশের মাটি, মানুষ, শেকড়, জীবনাচরণ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মত মৌলিক বিষয়কে পাস কাটিয়ে অথবা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া মডেল দিয়ে যে কখনই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় সেটি স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর এই ধ্রুপদী উন্নয়ন দর্শন শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, যেকোনো সময়ে যেকোনো দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। তাইতো আজও তিনি ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। সে কারণেই সবার প্রথমে আমাদের ‘বঙ্গবন্ধু-দর্শন’ বিষয়টি বুঝতে হবে।

“বঙ্গবন্ধু-দর্শন” হলো জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনদর্শন, রাষ্ট্র চিন্তা, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এবং সামগ্রিক উন্নয়ন ভাবনার সমন্বিত রূপ। তবে, “বঙ্গবন্ধু-দর্শন” শুধু উল্লিখিত বিষয়সমূহের যোগফল নয়, বরং পরস্পর সম্পর্কিত একটি সামগ্রিক রূপ। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষের রয়েছে অসাধারণ শক্তি, অসীম ক্ষমতা, জনগণই দেশের প্রকৃত মালিক তাই সব ধরনের নীতি নির্ধারণ ও কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে থাকবেন দেশের জনগণ। জনগণের স্বার্থ বিশেষত দরিদ্র মেহনতি মানুষের স্বার্থ ছিল তার কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। “জনগণ-বোধ”-ই বঙ্গবন্ধু দর্শনের মূল কথা। দেশপ্রেমের যত রূপ আছে, মানুষের প্রতি ভালবাসা, মহানুভবতা, মমত্ববোধ আর সহমর্মিতার যত রূপ আছে তার সব বৈশিষ্ট্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে অন্তর্নিহিত ছিল। এ কারণেই বঙ্গবন্ধুকে বলা হয় ‘দেশজ উন্নয়ন দর্শন’ (Home Grown Development Philosophy)-এর উদ্ভাবক।

বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙ্গালী জাতির পিতাই ছিলেন না। বিশাল হৃদয়ের এই মানুষটি যেমন আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তেমনি একজন দার্শনিক, একজন চিন্তক ও একজন শিক্ষক হিসেবে মানুষকে আলোকিত পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে আওয়ামী রাজনীতির দার্শনিক হিসেবে আজও তিনি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। দেশের যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে বারবার এই রাজনৈতিক গুরুর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হয়। বঙ্গবন্ধু যেন আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর এবং সব সমস্যার সমাধান দিয়ে রেখেছেন তাঁর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” এবং “কারাগারের রোজনামচা” গ্রন্থে। রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শুধু রাজপথেই নয়, বাঙ্গালী জাতির মননে-মগজে স্বাধিকারের চেতনা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। যেমনটি ফরাসী বিপ্লবের সময় রুশো, ভলতেয়ার মানুষকে পথ দেখিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন চিন্তার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল কৃষি, কৃষক এবং গ্রামীণ উন্নয়ন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব বিষয়ে বলা হয়েছে যে, “নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করিবার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকরণের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।” বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের প্রতিফলন আমরা আমাদের জাতীয় সংবিধানে লক্ষ্য করেছি। বঙ্গবন্ধু বারবার কৃষকদের কথা বলেছেন, কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, “গ্রামে গিয়ে কাজ করো, দুঃখের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়াও”। অন্য আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন, “কৃষি বিপ্লবের কথা বলেছি। আমাদের নজর দিতে হবে গ্রামের দিকে। কৃষকদের রক্ষা করতে হবে। শুধু কগজে-কলমে আর বই পড়েই কৃষি কাজ হয়না। গ্রামে যেয়ে আমার চাষি ভাইদের সাথে বসে প্রাকটিক্যালি কাজ করতে হবে।’'

বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও স্বপ্নের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন দর্শনে।

অদম্য হাসিনা’র অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের দিয়েছিলেন দেশ এবং স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সোনার বাংলা গড়ে তোলার। বঙ্গবন্ধুকন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা “সোনার বাংলা’র” আধুনিক রূপ ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করে পিতার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের পথে শেখ হাসিনার দক্ষ হাতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, খাদ্যে স্বনির্ভরতা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ অবকাঠামো, যোগাযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অসামান্য অগ্রগতি হয়েছে। হেনরি কিসিঞ্জারের সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বাংলাদেশ আজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বের বিস্ময়। তাঁর গণকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শন আজ বিশ্বের কাছে অনুকরণীয়।

কীভাবে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখল? কোন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বদলে দিলেন? তাঁর অনুপ্রেরণার উৎসই বা কী? শেখ হাসিনা শুধুই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত ও আদর্শের উত্তরাধিকার নন, যোগ্য শিষ্যও বটে। যোগ্য গুরুর যোগ্য শিষ্য তিনি। শেখ হাসিনা বারবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা ‘নীলকণ্ঠ পাখি’। বাঙালি জাতির স্বপ্নের সারথী, দেশের দীর্ঘতম সময়ের সফল প্রধানমন্ত্রী, উন্নয়নশীল দেশসমূহের মুখপাত্র হিসেবে বিশ্বনন্দিত, শান্তি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পতাকাবাহী অনুকরণীয় রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার সব ধরনের অনুপ্রেরণার উৎস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু দর্শনের সফল বাস্তবায়নকারী হিসেবে শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি তাদের দিন বদলের স্বপ্নপূরণে কাজ করে চলেছেন নিরন্তর।

বঙ্গবন্ধুর এই উন্নয়ন দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং কর্মসূচিতে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্বালে (২০১৮ সালে ১৮ ডিসেম্বর) ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবো।” ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ অঙ্গীকারের মাধ্যমে শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে স্পষ্টভাবে।

‘গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবস্থা কিছু কথা’ প্রবন্ধে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘গ্রামকেই করতে হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু’। তিনি এমন একটা গ্রামের স্বপ্ন দেখিয়েছেন যেখানে গ্রামে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ পাবে শহুরে জীবনের নানা সুযোগ-সুবিধা, কৃষকের সন্তান গ্রামের স্কুল থেকে রাজধানীর নামিদামি স্কুলের মানের শিক্ষা লাভ করবে, গ্রামের চিকিৎসা কেন্দ্রেই পাওয়া যাবে প্রয়োজনীয় সাধারণ চিকিৎসাসেবা, টেলিমেডিসিন এবং ছোট ছোট রোগ সারানোর জন্য ঢাকামুখী যাতায়াত করতে হবে না, ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে উপজেলা বা জেলা শহরে না গিয়েও পাওয়া যাবে সরকারি সেবা। সাধারণ মানুষ, গ্রাম, কৃষি এবং নিজস্ব সংস্কৃতি নির্ভর এমন বাংলাদেশেরই স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। পিতার মতই জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। এসব মানুষকে সর্বাধিক সুবিধা দিয়ে উন্নয়নের মূল ধারায় নিয়ে আসাই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য।

মানুষকে ভালবেসে, পরম মমতায় তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজ তিনি করে চলেছেন শেখ হাসিনা। সব হারানো শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরেই আওয়ামীলীগের হাল ধরার পাশাপশি সারা বাংলাদেশ বিচরণ করলেন, মানুষের কথা শুনলেন এবং মানুষের মধ্যে মিশে গেলেন। বঙ্গবন্ধুর মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারাদেশের পথে প্রান্তরে ঘুরলেন এবং তাদের একত্রিত করলেন। শেখ হাসিনা জানেন এদেশের মানুষ কী চায়। সমগ্র বাংলাদেশর জেলা, উপজেলা, গ্রামসহ সেখানকার নদ-নদী, গাছপালা, সংস্কৃতি শেখ হাসিনার জ্ঞান বিস্ময়কর। সে কারণেই হয়তো দেশের মানুষ, তাদের সমস্যা, দুঃখ, বেদনা সম্পর্কে তাঁর চেয়ে আর কেউ ভাল জানেননা। তিনি সারা বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে রয়েছেন। বাংলাদেশকে তিনি সবচেয়ে ভাল চেনেন, ভাল বোঝেন তাই তাঁর হাতেই বাংলাদেশ সবচেয়ে নিরাপদ।

আমার পরম সৌভাগ্য যে আমি বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের উত্তরাধিকার জননেত্রী শেখ হাসিনার একজন সামান্য কর্মী হিসেবে ১০ বছর তাঁর দপ্তরে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাঁর দপ্তরে থেকে তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখা, তাঁর নির্দেশনায় কাজ করার যে সুযোগ আমি পেয়েছি সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা, তাঁর লেখা প্রবন্ধ, বই থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং প্রতিনিয়ত শিখছি। তাঁর আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক আলোচনায়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাঁর অবস্থান, মানুষকে ভালবাসা, মানুষকে মূল্যায়ন করার বিষয়গুলো আসলে আমার এবং আমাদের জন্য এক ধরনের অবশ্যপাঠ্য টেক্সট।

এতো বাধা-বিপত্তি, ষড়যন্ত্র, দুঃখ, বেদনার পরেও কীভাবে তিনি অবিচল থেকে কাজ করে চলেছেন সেটাই একটা বড় বিস্ময়। অনেকের নিশ্চয় মনে আছে, ২০১০ সালের নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য রুনা এবং রতনা এই দুই বোনকে কীভাবে তিনি নিজের মেয়ে হিসেবে মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাদের সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের বিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের সুখ-দুঃখ সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছেন। নিজেদের হাজারো সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে তিনি যেভাবে দাঁড়িয়েছেন, পরম মমতায় তাঁদের আগলে রেখেছেন সেটা সত্যিই বিরল। রোহিঙ্গাদের সমস্যাকে তিনি নিজের বা নিজেদের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। একটা দীর্ঘ সময় তিনি শরণার্থী হিসেবে নির্বাসিত জীবন যাপন করেছেন, তাই শরণার্থী জীবনের কষ্ট ও বেদনা তাঁর চেয়ে ভাল আর কারো বোঝার কথা না। সে কারণেই তিনি শরণার্থীদের জন্য মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তৃতা (সেপ্টেম্বর ২০২২) করার সময় শরণার্থীদের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছেন।

এ বছর জুলাই মাসে সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা ও ঝড়–বৃষ্টির মধ্যে জমিলা বেগম নামের এক মহিলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি ফুটফুটে ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। শেখ হাসিনা দুর্যোগে জন্ম নেওয়া এ শিশুর নাম রাখেন নূহ আলম প্লাবন। নবজাতক প্লাবনকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নতুন পোশাক, মশারি, তেল, লোশনসহ উপহারসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগে, সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন সেটা আজকের দিনে দেখা যায়না বললেই চলে। সাধারণ মানুষের দুঃখে-কষ্টে শেখ হাসিনার মধ্যে যে গভীর প্রতিক্রিয়া ও সমানুভুতি দেখেছি, তারই প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই তাঁর উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণে। সবখানে মানুষ তাঁর কাছে প্রধান উপজীব্য। অনেক কঠিন বিষয়কে তিনি মানবিকভাবে সমাধান করেছেন। এ প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আমাদের দেশে বড় বড় ভবন এবং অবকাঠামো নির্মাণের ছোট-খাট কাজ (যেমন খোয়া ভাঙ্গা, পানি তোলা ইত্যাদি) নির্মাণ শ্রমিকদের দিয়েই করানো হয়। অথচ এই কাজগুলো মেশিনের সাহায্যে করানো হলে সময় ও খরচ দুটোই বাঁচানো সম্ভব। সময় ও অর্থ বাঁচাতে গিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক নির্মাণ শ্রমিক যেন কর্মহীন হয়ে না পড়েন সেই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে এসব ক্ষেত্রে মিনিমাম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

গত এক যুগে শেখ হাসিনা পুরো বাংলাদেশের খল নলচে বদলে দিয়েছেন। অবকাঠামো থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টরকে মানুষের জন্য কল্যাণকর হিসেবে প্রস্তুত করে তুলেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে দ্রুত উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষিত থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেনি কারণ শেখ হাসিনা জানেন কী করতে হবে এবং কীভাবে করতে হবে। দেশের কৃষি এবং কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে তিনি বিভিন্ন সময় ভর্তুকি দিয়েছেন, করোনা সংকটে প্রণোদনা দিয়েছেন, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করেছেন, সবার জন্য ভ্যাক্সিনের ব্যবস্থা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এসব উদ্যোগে ঝুঁকি ছিল, আর ছিল উন্নয়ন সহযোগী, দাতা সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরামর্শকগোষ্ঠী, এনজিও এমনকি বুদ্ধিজীবীদের নানারকম পরামর্শ। তারা আশঙ্কার কথা বলেছেন, গাইডলাইন দিয়েছেন এমনকি প্রচ্ছন্ন ভয়ও দেখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা কারো কথায় কর্ণপাত না করে, মানুষের জন্য যেটা জরুরি সেটাই করেছেন। তিনি তাঁর লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থেকেছেন।

নারীর ক্ষমতায়নকে তিনি একাডেমীক আলোচনার মধ্যে না রেখে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছেন। শুধু রাজধানী ঢাকা বা বড় বড় শহরেই নয়, নারীর ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রী, সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ট্রেন চালক, বৈমানিকসহ অসংখ্য জায়গায় তিনি নারীদের নিয়ে এসেছেন। শুধু কোটা পূরণের জন্যই নয়, নারী যেন তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের সুযোগ পায় সে ব্যবস্থা তিনি করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন উদ্যোগ প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিশোরী, নারীদের মনে অসীম সাহসের সঞ্চার করেছে। সন্তানের বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম লেখা যখন বাধ্যতামূলক করা হলো তখন আমার মনে হয়েছিল আমি যেন ৪৫ বছর আগে মারা যাওয়া আমার মাকে নতুন করে খুঁজে। এতদিন আমার মত মা হারা সন্তানদের কোথায় মায়ের নাম জানতে চাওয়া হয়নি বা দরকার হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সরাসরি নারীদের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচিত হয়ে আসার বিষয়টি যেকোনো দেশ বা সময়ের প্রেক্ষাপটেই একটা মাইলফলক।

কৃষি বাংলাদেশের সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং দেশের অর্থনীতির প্রাণ। বাংলাদেশের জনগণের একটা বিশাল অংশের জীবনধারণ নির্ভর করে কৃষির উপর। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাঁর উন্নয়ন দর্শনে এবং অগ্রাধিকার তালিকায় কৃষি ছিল একেবারে প্রথম দিকে। ঠিক একইভাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। এসব উদ্যোগের মধ্যে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি গবেষণা, সার-বীজ-সেচ ও কীটনাশকের জন্য ভর্তুকি প্রদান, সেই ভর্তুকির টাকা কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক একাউন্টে সরাসরি প্রেরণ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কৃষি ও কৃষকবান্ধব ইকো-সিস্টেম গড়ে তোলার কাজটি এতো সহজ ছিলনা। উন্নয়ন সহযোগী, দাতা সংস্থা, পরামর্শকগোষ্ঠী, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিগণ প্রধানমন্ত্রীর এমন কৌশলের নেতিবাচক সমালোচনা করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের সমালোচনা উপেক্ষা করে কৃষি ও কৃষকদের কল্যাণে কাজ করেছেন। এসব কাজের দারুণ ফল পেয়েছে বাংলাদেশ। এক সময়ের খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম আবিষ্কার করেছেন পাটের জিনোম সিকুয়েন্সিং। সারা বিশ্বে আজ পর্যন্ত মাত্র ১৭ টি উদ্ভিদের জিনোম সিকুয়েন্সিং হয়েছে, তার মধ্যে ড. মাকসুদ করেছেন ৩টা।

জননেত্রী শেখ হাসিনা’র কিছু সাহসী উদ্যোগ সমগ্র বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। এমন অসংখ্য উদ্যোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তুলে ধরা হলো:

1. বই উৎসবের মাধ্যমে বছরের শুরুতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ
2. ১৫ কোটি নাগরিকের জন্য অনলাইন জন্মনিবন্ধন
3. প্রায় এক কোটি মানুষের জন্য রেশন কার্ড চালু
4. ১ লক্ষ ৮০ হাজার+ পরিবারের জন্য আশ্রয়ণের ব্যবস্থা
5. দেশজুড়ে ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা
6. কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত নারীর ক্ষমতায়ন
7. ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ
8. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা
9. বিনামূলে করোনা টিকাদান
10. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (দুস্থ মহিলা, বিধবা, প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা এবং বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস)
11. বঙ্গবন্ধুর খুনিদের এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
12. ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়ন
13. ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান
14. পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন
15. দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায়
একজন দার্শনিকের তত্ত্বকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য দরকার হয় একজন যোগ্য শীষ্যের। বঙ্গবন্ধু নামের সেই মহান দার্শনিকের যোগ্য শীষ্য হচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ ঠিক যেভাবে দেখতে চেয়েছিলেন, ঠিক সেটাই বাস্তবায়ন করে চলেছেন তাঁর কন্যা। গত এক দশকে শেখ হাসিনা যেভাবে পঞ্চগড়সহ সারাদেশকে বদলে দিয়েছেন সেটা সত্যিই অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয়। চোখের সামনে দেখলাম কীভাবে তিনি উত্তরবঙ্গের মানুষের এক সময়ের নিয়তি আশ্বিন-কার্ত্তিক মাসের মঙ্গা দূর করলেন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিয়ে তিনি হারিকেন দূর করলেন। উপজেলা বা জেলা শহরে না গিয়েও এখন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে সরকারি প্রায় সব সেবা পাওয়া যায়। মানুষ সেবা’র পেছনে ছুটছেনা, বরং সেবা চলে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায় অথবা আঙ্গুলের ডগায়। ঢাকা থেকে পঞ্চগড় সরাসরি ট্রেন চলাচল আর এখন স্বপ্ন নয়। আমাদের ছেলে-মেয়েরা শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব থেকে কম্পিউটার শিখছে আর বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে। মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্টের মাধ্যমে পাঠদান ক্লাসরুমকে করেছে আনন্দময় এবং কার্যকর। শেখ হাসিনার সততা, দৃঢ়তা আর গণকেন্দ্রিক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই চোখের সামনে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ আজ পরীক্ষিত উন্নয়ন মডেল।

যেকোনো সমাজ বা দেশের মানুষের জন্য এক বা একাধিক সুযোগ সৃষ্টি করা হলে সেখান থেকে অসংখ্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। আপাত দৃষ্টিতে সম্পর্কহীন একটি ঘটনা অন্য অনেক ঘটনাকে বা বিষয়কে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থনীতির পরিভাষায় এটাকে Spill Over Effect বলা হয়ে থাকে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় দেশজুড়েই সাধারণ মানুষ বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের যে ক্ষমতায়ন হয়েছে সেটা অবিশ্বাস্য। ইন্টারনেট ব্যবহার করে ই-কমার্স এর মাধ্যমে পঞ্চগড়ের একজন নারী ঢাকায় বসবাসকারী পঞ্চগড়ের কারো কাছে ‘সিদল’ (জনপ্রিয় এবং স্থানীয় ঐতিহ্য খাবার) বিক্রি করতে পারছেন। শেখ হাসিনা উন্নয়নের ‘চুইয়ে পড়া তত্ত্ব’-Trickle Down Theory (সকল উন্নয়ন হবে কেন্দ্রে এবং সেটা চুইয়ে পড়বে প্রত্যন্ত অঞ্চলে) অনুসরণ না করে সরাসরি মানুষের কাছে গেছেন। মানুষের জীবনে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। যে জিনিসটা অনেকেই দেখতে পাননি, আন্দাজ করতে পারেননি, তিনি এটা ঠিকই অনুধাবন করেছেন এবং সেভাবে কাজ করেছেন। কারণ তিনি মানুষের মধ্যে থেকেই উঠে এসেছেন। সহানুভূতির (Sympathy) চোখে নয় তিনি মানুষকে দেখেছেন সমানুভূতির (Empathy) চোখে। নিশ্চয় বঙ্গবন্ধু উপর থেকে দেখছেন এবং তাঁর প্রিয় হাসু’র জন্য দোয়া করছেন।

এতো বেদনা নিয়ে একজন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা যদি বারবার পেছন ফিরে তাকাতেন, প্রতিহিংসাপরায়ণ হতেন তবে কখনই আমরা আজকের বাংলাদেশ পেতামনা। বাংলাদেশ আটকে যেত, তলানিতে থেকে যেত। এ বিষয়ে প্রকৃতি থেকে একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আমরা জানি, হরিণ ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে অন্যদিকে বাঘের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার। তারপরেও হরিণ বারবার বাঘের শিকারে পরিণত হয়। এর কারণ হচ্ছে হরিণ বিশ্বাস করে সে বাঘের চেয়ে দুর্বল, তাই যখন হরিণ বাঘের হাত থেকে পালাতে থাকে তখন বারবার পেছন ফিরে তাকাতে থাকে। ফলে তার গতি কমে যায় এবং একসময় বাঘের শিকারে পরিণত হয়। শেখ হাসিনা কখনওই বিশ্বাস হারাননি, বারবার পেছন ফিরেও তাকাননি তাই তিনি এবং তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অদম্য এবং অপ্রতিরোধ্য। শোককে তিনি শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। সেই শক্তিতে বলিয়ান হয়ে লক্ষ্য স্থির রেখে তিনি এগিয়ে নিয়েছেন প্রিয় মাতৃভূমিকে।

জয় আমাদের হবেই হবে
আটোয়ারী উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের দরিদ্র বিধবা রোকেয়া বেগম স্বপ্নেও ভাবেননি ঢাকা থেকে ছেলের পাঠানো টাকা এক মিনিটের মধ্যেই তিনি পেয়ে যাবেন। ময়মনসিংহের দিনমজুর শফিকুল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননা, যখন দেখেন তাঁর ছেলে শাজাহান কম্পিউটারের সামনে বসে বিদেশিদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলছে, তাদের জন্য কাজ করছে আর ডলারে বেতন পাচ্ছে। এদিকে আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ওমর ১২ বছর পর দেশে ফিরে নিজের গ্রামটাকে যেন চিনতেই পারছেননা। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে গিয়ে তিনি অবাক হয়ে দেখেন, যেসব কাজের জন্য মানুষকে কয়েকবার জেলা শহরে যেতে হতো, সেসব কাজ এখন এখানে বসেই করা যাচ্ছে। সবকিছু যেন স্বপ্নের মত মনে হয় ওমর সাহেবের কাছে। পিরোজপুরের ফিরোজ গ্রামে বসে অনলাইন প্রশিক্ষণ শেষ করে পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকার একটা বড় আইটি কোম্পানিতে চাকুরি পেয়েছে। চাকুরিতে জয়েন করার আগে একবারের জন্য তাকে ঢাকা যেতে হয়নি বা কারো সাথে যোগাযোগ করতে হয়নি। এভাবেও যে চাকুরি হয় এটা ফিরোজ বা তাঁর পরিবারের কেউ এটা স্বপ্নেও ভাবেননি।

মাত্র এক যুগ আগেও কি আমরা এমন বদলে যাওয়া গ্রাম, বদলে যাওয়া শহর আর বদলে যাওয়া বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, বা স্বপ্ন দেখার সাহস করেছিলাম? কেউ কি কখনও স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, একদিন বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকবে, লাল-সবুজের পতাকা খচিত ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ মহাকাশে নিজ কক্ষপথে ঘুরতে থাকবে। হ্যাঁ, সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই স্বপ্নপূরণ আমরা দেখলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে আমাদের সামনে রূপকল্প হাজির করেছিলেন। শেখ হাসিনার দেয়া রূপকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা প্রণয়ন, অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং সার্বিক তদারকির কাজটি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক মাননীয় উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়। বিশ্বের কাছে তিনি “আর্কিটেক্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ” নামে সর্বাধিক পরিচিত। বদলে যাওয়া এই বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম কারিগর তিনি। এই বাংলাদেশে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষটি আজ সবচেয়ে বড় উপকারভোগী। তথ্যপ্রযুক্তিকে কার্যকর উপায়ে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের স্বপ্নপূরণের এই বাংলাদেশী দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। অসংখ্য আন্ত‍র্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার এখন বাংলাদেশের ঝুলিতে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক মাননীয় উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাথে ১০ বছরের বেশি সময় কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সজীব ওয়াজেদ জয়কে শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার সন্তান এবং বঙ্গবন্ধুর নাতি হিসেবে বিবেচনা করলে তাঁর জ্ঞান, মেধা, দেশপ্রেম, নেতৃত্ব গুণের প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ এর আর্কিটেক্ট, তিনি আপন মহিমায় উদ্ভাসিত। সজীব ওয়াজেদ জয়ের আলোয় আলোকিত আজ বাংলাদেশ। আমার পরম সৌভাগ্য যে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মহাযজ্ঞে তিনি আমাকে তাঁর সাথে রেখেছেন। সফলভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পর তিনি বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিছেন।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদ জয় এর জীবনেও রয়েছে কষ্ট বেদনা। বঙ্গবন্ধুর নাতি হবার অপরাধে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। পরিবার থেকে দূরে থাকলে জয় পড়াশুনা চালিয়ে গেছেন। তাঁর এবং তাঁর পরিবারের উপর অত্যাচার নিপীড়নের জবাব তিনি দিতে চেয়েছিলেন নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার মাধ্যমে। তারুণ্যের অহংকার জয় তাঁর মায়ের মতই পিছন ফিরে না তাকিয়ে কীভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেটা নিয়েই কাজ করছেন। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল বাংলাদেশ এসব বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সন্তান জয়কে শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে তিনি আর্কিটেক্ট হিসেবে আমাদের সামনে ছিলেন আর আমার মত সাধারণ কর্মীরা রাজমিস্ত্রি হিসেবে তাঁর পেছনে থেকে কাজ করে গেছি। আমার জীবন ধন্য হয়েছে। আমার মত একজন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কর্মীর জীবনে এর চেয়ে বড় ঘটনা আর কী হতে পারে?

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে বিশ্ব। তাই প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে বিশ্ব। বদলে যাচ্ছে প্রতিযোগিতার ধরন। গবেষণা আর উদ্ভাবনে ভর করে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশলপত্র হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা-২০৪১ ঘোষণা করেছেন। উচ্চ আয়ের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সেই স্বপ্ন পূরণে আমাদের সাথে আছেন আর্কিটেক্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ সজীব ওয়াজেদ জয়। জয় আমাদের হবেই হবে।

আমি বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে হয়তো বাংলাদেশের জন্মই হতোনা, আর শেখ হাসিনা না থাকলে আমরা আজকের বাংলাদেশ পেতামনা। বঙ্গবন্ধু পরিবারের কাছে আমার অনেক ঋণ। যেকোনো সংশয় ও সংকটে আমি বারবার মহান দার্শনিক এবং রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধুর কাছে ফিরে যাই। শিক্ষক শেখ হাসিনার কাছ থেকে আমি শিখি কীভাবে মানুষকে ভালবাসতে হয়, সম্মান করতে হয় এবং মানুষের হাত ধরে এগিয়ে নিতে হয়। বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়েছিলেন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যা দিয়েছেন মধ্য আয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ। আর বঙ্গবন্ধুর নাতি এবং প্রধানমন্ত্রীর সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় তাঁর জ্ঞান, মেধা, দক্ষতা ও অসাধারণ নেতৃত্বের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ আয়ের উন্নত দেশ হিসেবে রূপান্তরের করবেন, এ স্বপ্নটাই এখন সমগ্র বাংলাদেশের স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পারিবারিক পরম্পরা থেকে অর্জিত শিক্ষা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সবাইকে নিয়ে আমরা আমাদের স্বপ্নের পঞ্চগড় গড়ে তুলতে চাই। তাই আজ আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।

প্রিয় এলাকাবাসী,
এবার আপনাদের একটু পেছনে নিয়ে যেতে চাই। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারিখ পঞ্চগড় শহরের শের-ই-বাংলা পার্কে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন কুড়িয়ে মালা গেঁথে উপস্থাপন করেছিলেম ‘স্বপ্নের পঞ্চগড় কেমন দেখতে চাই’ নামক আঞ্চলিক ইস্তেহার!” এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- বরেণ্য শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বণ্যা, বিশিষ্ট তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ও ব‍র্তমানে ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার, সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সাংবাদিক মুনি সাহা এবং এলাকার সাধারণ মানুষ। আমরা আমরা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে পঞ্চগড়-এক এর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছি এবং নানান শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে বসেছি, যাদের কথা কেউ শুনেনা তাঁদের কথা শুনেছি, যাদের ব্যাথা কেউ অনুভব করেনা তাঁদের তাঁদের বোঝার চেষ্টা করেছি এবং যাদের কেউ দেখেনা তাঁদের সাথে দেখা করেছি।

সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, পাওয়া-না পাওয়া, স্বপ্ন, প্রত্যাশা বোঝার জন্য আমাকে বই পড়তে হয়নি। একজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়েই তাঁদের দেখেছি, বুঝেছি। তাঁদের গল্পগুলো আসলে আমার গল্প। আমরা রিক্সাচালক থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, আইনজীবীসহ প্রায় সব পেশা ও বয়সের মানুষের সাথে তাঁদের দোরগোড়ায় গিয়ে আলাদা আলাদাভাবে বসেছিলাম। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে তাঁদের স্বপ্নের কথা শোনা এবং তাঁদের যুক্ত করে সেই স্বপ্নপূরণের এই ব্যাতিক্রমধর্মী উদ্যোগ বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়। আলোচনায় আসার জন্য বা প্রশংসা পাবার জন্য নয়, আমাদের বিশ্বাস প্রতিফলিত হয় আমাদের কাজের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এটাই আমাদের শিখিয়েছেন।

আমার স্বপ্ন আমরা সবাই মিলেই আমাদের সম্মিলিত স্বপ্নগুলো পূরণ করতে একসাথে কাজ করবো। যেখানেই থাকি, যেভাবেই থাকি পঞ্চগড় এক সংসদীয় এলাকার সাধারণ মানুষের পাশে থাকবো। পরিবার, বন্ধু এবং আপনাদের মত অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে আমি ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-এক আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিতে থাকি। আমাদের সংসদীয় এলাকার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ছাত্র -শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সাধারণ মানুষদের নিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করি এবং জমা দেই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বলা হয়, আমি যেন এই মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা করি এবং পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি এবং সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাঁদের জন্য কাজ করতে থাকি। আমি নেত্রীর সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি, একবারের জন্যও আপনাদের ছেড়ে যাবার কথা ভাবতে পারিনি। আপনারা আপনাদের যে হাত আমার জন্য বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আমি সেই হাত শক্ত করে ধরে ছিলাম, আছি এবং থাকবো ইনশাল্লাহ।

আমাদের স্বপ্ন কুড়ানোর কাজ কিন্তু থেকে থাকেনি। বছর জুড়েই আমরা আপনাদের সাথে নিয়মিতভাবেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। উৎসবে, পার্বণে, চায়ের দোকানে অথবা রাস্তায় আপনাদের সাথে হাত মিলিয়েছি, আপনাদের আনন্দ-বেদনার কথা শুনেছি। এবছর মে মাসে আমরা পঞ্চগড়-এক আসনের তিনটি উপজেলায় মটর শ্রমিক, চা শ্রমিক, পাথর-বালু শ্রমিক, হকার সমিতি, রিক্সা শ্রমিক, টমেটো চাষি, পান চাষি, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর শ্রমিক, নারী, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, আলেম-ওয়ালেমা, সাঁওতাল আদিবাসী এবং আহমেদিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে মোট ১৬ টি উঠান বৈঠকের আয়োজন করি। প্রত্যেকটি উঠান বৈঠকে সাধারণ মানুষ প্রাণ খুলে তাঁদের সুখ, দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ ও স্বপ্নের কথা বলেছেন। আজ থেকে ৫ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৭ সালে মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিল আজ সেই স্বপ্ন তাঁদের কাছে পুরাতন। সময় বদলেছে তাই মানুষের চিন্তা-ভাবনা, চাহিদা ও প্রয়োজনও বদলেছে। আজকের পঞ্চগড়বাসী অনেক সচেতন এবং অনেক আধুনিক। তাঁদের জীবন-মানে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।

প্রিয় এলাকাবাসী,
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী এবং সবচেয়ে প্রাচীন, বৃহত্তম এবং নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বাংলার মানুষ পর পর তিন মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। এই তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের নিকট প্রদত্ত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পাশাপাশি সংঘাত, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের উত্থান মোকাবিলায় সরকারের দৃঢ়তা ও সাফল্য জনমনে নতুন এক সাহসের সঞ্চার করেছে। সমুদ্র বিজয়, মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন, ১০০ টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং এমন অসংখ্য উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে চলেছে। এছাড়া দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১০টি মেগা প্রকল্প যেমন কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মাস-র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল, মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন, পায়রা সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন স্থাপন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

উন্নয়নের এই ছোঁয়া লেগেছে পঞ্চগড়েও। অন্যান্য নিয়মিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পঞ্চগড় জেলায় চা চাষ, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর চালু, ছিটমহল সমস্যার সমাধান ইত্যাদি শেখ হাসিনা সরকারেরই অবদান। সম্ভাবনার এ স্বর্ণদুয়ার উন্মোচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জননেত্রী শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন অতীতের ঐতিহ্য সুরক্ষা, বর্তমানের সফল পথচলা এবং ভবিষ্যতের সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া তোলার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, অকুতোভয় ও বিশ্বস্ত কাণ্ডারি।

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে, সাধারণ মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন তাঁরই যোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকার, পরিকল্পনা, ইশতেহার, ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কল্যাণেই বাংলাদেশ আজ এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। প্রতিটি নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি সময়োপযোগী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন এবং তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেছেন। ইতঃপূর্বে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি 'দিনবদলের সনদ' এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে 'এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ' শিরোনামে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্বালে ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেন। তাঁর প্রতিটি নির্বাচনী ইশতেহার আসলে ছিল সাধারণ মানুষের স্বপ্নের প্রতিফলন।

একজন সাধারণ নেতা পরবর্তী একটা বা দুইটা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করে থাকেন। যেকোনো উপায়ে নির্বাচনে জয়ী হতে তারা দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত থাকেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনার মত একজন রাষ্ট্রনায়ক পরবর্তী কয়েক দশক দেখতে পান এবং সেভাবেই পরিকল্পনা করে থাকেন সে অনুযায়ী রূপকল্প উপস্থাপন করে থাকেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প-২০২১ এর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। ২০৪১ সালের মধ্যে তিনি বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের উন্নত দেশ এবং ২০৭১ সাল নাগাদ সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আর এ ধারাবাহিকতায় ২১০০ সালের মধ্যে বন্যা, নদী ভাঙন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’। সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন প্রশ্নে এভাবেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অনন্য।

আমরা বিশ্বাস করি, জাতীয় পর্যায়ে যেমন উন্নয়ন রূপকল্প থাকতে পারে তেমনি স্থানিক উন্নয়ন দর্শন বা স্বপ্ন থাকা দরকার। আমাদের স্বপ্ন হলো, একটি সুখি, সমৃদ্ধ, আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক, আত্মনির্ভরশীল এবং মানবিক পঞ্চগড় গড়ে তোলা। সকল শ্রেণীপেশার মানুষকে সংযুক্ত করে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমেই আমরা আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। কৃষি, শিক্ষা, পর্যটন, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব বৈচিত্র্য, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি আর প্রশিক্ষিত দক্ষ মানবসম্পদ নিয়েই পঞ্চগড়-এক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং মাননীয় প্রধামন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশের মডেল হিসেবে পরিচিত হতে চায়। তাই পঞ্চগড়ের উন্নয়নে নানারকম ক্ষেত্রভিত্তিক পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।

আমাদের উন্নয়ন চিন্তা বা দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছেন গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। তারাই আমাদের আঞ্চলিক ইশতেহারের প্রধান উপজীব্য। আমরা সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনা আর সমস্যা-সম্ভাবনা তাঁদের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। এ অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক বিন্যাস ও নৈসর্গিক বৈচিত্র্য যেমন নদীনালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর, গাছপালা, বনবাদাড়, পশু-পাখি তরু-লতা, দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, খেতখামার, সব ঠিক রেখে এবং গ্রামের নিজস্বতা বজায় রেখে শহরের সকল সুযোগ-সুবিধা এ অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি সাধারণ মানুষের রয়েছে অসাধারণ ক্ষমতা। আমরা এই ক্ষমতা কাজে লাগাতে চাই।

‘সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার

ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার’

স্বপ্নের পঞ্চগড়-এক বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারসমূহ:
জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, রূপকল্প, বিভিন্ন মেয়াদের লক্ষ্যমাত্রা এবং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন, চাহিদা এবং স্বপ্নের আলোকে আমরা তৈরি করেছি পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক ইশতেহার। জাতীয় ইশতেহারের আলোকে প্রস্তুত আমাদের এই আঞ্চলিক ইশতেহারে শিক্ষাকে সব ধরনের পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেছি। পাশাপাশি উন্নয়ন ভাবনাকে আমরা একটু ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেছি। উন্নয়ন বিষয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, উন্নয়ন বলতে আমরা অবকাঠামোকেই বুঝে থাকি। দালান, রাস্তা, ব্রিজ ইত্যাদি মানেই যে উন্নয়ন নয় সেটা আমরা আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানে উপলব্ধি করতে পেরেছি এবং সে আলোকেই আমাদের অগ্রাধিকার, পরিকল্পনা, কর্মসূচি এবং অঙ্গীকারমালা সাজিয়েছি।

আমাদের আঞ্চলিক ইশতেহার আমরা যে ৫ টি বিষয়কে অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রেখেছি সেগুলো হচ্ছে:

১) দিন বদলের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষা;
২) কৃষি ও কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ;
৩) গ্রামকেন্দ্রিক অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন- আমার গ্রাম, আমার শহর;
৪) তারুণ্যের শক্তি, পঞ্চগড়ের সমৃদ্ধি;
৫) টেকসই উন্নয়নে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ;
উল্লিখিত ৫ টি অগ্রাধিকার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো:

(১) দিন বদলের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষা:

প্রতিটি মানুষই একটি পরিপূর্ণ জীবন প্রত্যাশা করে। সে জীবন হবে একইসঙ্গে নান্দনিক ও আনন্দময়। পাশাপাশি মানুষ পারিবারিক, সামাজিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিজের অর্থপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে চায়। শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হলো জীবনকে অর্থবহ করে তোলার দৃষ্টিভঙ্গি ও সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। একই সঙ্গে জীবিকা অর্জনের উপযোগী একজন দক্ষ ও মানবিক মানুষে পরিণত করা। আর কাঙ্ক্ষিত জীবিকা নির্ধারণের জন্য মানুষকে যোগ্য, দক্ষ ও সৃষ্টিশীল করে গড়ে তোলাই শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি (২০১০) অনুযায়ী শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে, “মানবতার বিকাশ এবং জনমুখী উন্নয়ন ও প্রগতিতে নেতৃত্বদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, নিজের এবং অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপেমিক এবং কর্মকুশল নাগরিক গড়ে তোলা। পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমেই জাতিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে।”

পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে মানুষের জীবন ও জীবিকা বদলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উৎকর্ষের কারণে পরিবর্তনের গতিও হয়েছে অনেক দ্রুত। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাত্রা পৃথিবীর ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে এগিয়ে চলেছে অভাবনীয় গতিতে । চতুর্থ শিল্পবিপ্লব পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ নজিরবিহীন পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে মানুষের কর্মসংস্থান এবং জীবনযাপন প্রণালীতে, যেখানে যন্ত্র ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক আরো নিবিড় হচ্ছে। এমনকি কাজের ক্ষেত্রে মানুষ এবং যন্ত্রের ভেতর ব্যবধানও কমে যাচ্ছে অনেক। এর ফলে বর্তমান সময়ের কর্মজগতের অনেক কিছুই ভবিষ্যতে যেমন থাকবে না, ভবিষ্যতে তেমনি অনেক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে যা বর্তমান সময়ে অবস্থান করে ধারণা করা সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের কারণে যেমন দেশে-দেশে, সমাজে-সমাজে ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচে যাচ্ছে, তেমনি আবার নগরায়ণ, জলবায়ুর পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্দেশিক অভিবাসন আমূল পাল্টে ফেলছে সনাতন জীবন ব্যবস্থা। প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ।

এসব চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তার টেকসই ও কার্যকর সমাধান এবং সম্ভাবনার সুফল গ্রহণের জন্য জ্ঞান, দক্ষতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন দূরদর্শী, সংবেদনশীল, মানবিক এবং যোগ্য বিশ্ব-নাগরিক প্রয়োজন। দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ের এই প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু, অবকাঠামো তৈরি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কাজ রাতারাতি বাস্তবায়ন করা যেকোনো দেশের জন্যই কঠিন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটা আরও কঠিন। তাই আমাদের এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে যেখানে বিদ্যমান শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে থেকে সময়ের প্রয়োজনে দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম এবং প্রাসঙ্গিক উদ্যোগ নেয়া। কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য অপেক্ষা না করে এসব উদ্যোগ আমরা স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করে স্থানীয়ভাবে নিতে চাই। সার্টিফিকেট প্রদান এবং শিক্ষার্থীকে চাকুরী বাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলা, এই চিন্তা ও চর্চা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সার্টিফিকেট এবং চাকুরি অবশ্যই জরুরি, তবে এটাই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়।

শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ, জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি লালনকারী সৎ, নৈতিক, মূল্যবোধসম্পন্ন, বিজ্ঞানমনস্ক, আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ, সৃজনশীল ও সুখী একটি প্রজন্ম তৈরি করা। যে প্রজন্ম স্বকীয়তা বজায় রেখে অপরের কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার পাশাপাশি সমাজের ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে সচেষ্ট হবে। একজন শিক্ষিত তরুণ বা তরুণী যেন দেশপ্রেমিক, দায়িত্বশীল এবং উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারে সেটাই হবে আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আমাদের আগামী প্রজন্ম হবে দেশপ্রেমিক, অসাম্প্রদায়িক, সংবেদনশীল, সমানুভূতিশীল এটাই আমাদের স্বপ্ন। একজন বিদ্বান মানুষ প্রতিভাবান হতে পারেন কিন্তু তিনি যদি দেশীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে অস্বীকার করেন, মানুষকে সম্মান না করেন, উদার চিন্তা অধিকারী না হন, মাদকাসক্ত হয়ে থাকেন তবে সে প্রতিভা আমাদের সমাজের জন্য বা দেশের জন্য সামান্যই কাজে লাগবে।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই লক্ষ্য পূরণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার শিক্ষা। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছি তাঁর প্রধান হাতিয়ার বা অনুঘটক হবে শিক্ষা। আমাদের দেশে যথেষ্ট পরিমাণে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিক্ষার জন্য আছে অবকাঠামো, আছে শিক্ষক এবং বিনামূল্যে পাঠ্য পুস্তকের ব্যবস্থা। সেই সাথে রয়েছে বিনামূল্যে “মিড-ডে মিল” এর ব্যবস্থা। এ বিষয়গুলো সরকার কেন্দ্র থেকে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং মনিটরিং করে। এখানে আমাদের করণীয় সামান্যই। আমরা যেটা করতে পারি সেটা হচ্ছে, ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের সচেতন করা তারা যেন বিদ্যমান অবকাঠামো ও সুযোগ সুবিধার মধ্যে থেকে সর্বোচ্চটা নিতে পারে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি সবাইকে এক করে সমন্বিত নেতৃত্বের মাধ্যমে কাজ করতে চাই আমরা। সার্বিক বিষয়টি হবে গণকেন্দ্রিক।

(২) কৃষি ও কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ:

বাংলাদেশ কৃষি নির্ভর দেশ। হাজার বছর ধরে কৃষি আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। কৃষি পঞ্চগড়ের মানুষেরও প্রধান পেশা। সঙ্গত কারণেই এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হয় কৃষিকে কেন্দ্র করে। পঞ্চগড়ের মাটি, আবহাওয়া কৃষি কাজের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। মা প্রকৃতি যেন নিজ হাতে পঞ্চগড়কে সাজিয়েছেন। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর উৎপাদিত ফসলের উদ্বৃত্ত অংশ বহুদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। কৃষি জমি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বহুবিধ কারণে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। পঞ্চগড়ের জন্যও একথা সমানভাবে সত্য।

একথা সত্য যে, কৃষিতে আমরা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছি কিন্তু আমরা যদি এখনই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ না করি তবে আমাদের খাদ্য ঘাটতির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা রয়েই যাবে। কাজেই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষ পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি আমাদের কৃষি বুহুমুখীকরণেরও উদ্যোগ নিতে হবে। ডাল, মসলাসহ নতুন নতুন জাতের শস্য এবং উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল উৎপাদনের দিকে আমরা মনোযোগ দিতে চাই। আমরা কৃষিকে বাঁচাতে চাই, কৃষককে বাঁচাতে চাই। কৃষি ও কৃষক বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে এবং অবশ্যই দেশ বাঁচবে।

(৩) গ্রামকেন্দ্রিক অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন- আমার গ্রাম, আমার শহর:

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্বালে ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। এ ইশতেহারে ২১টি বিশেষ অঙ্গীকার করা হয়েছে। এরমধ্যে আমার ‘আমার গ্রাম আমার শহর’-বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। আমার ‘গ্রাম-আমার শহর’ অঙ্গীকারের আওতায় দেশের প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ অঙ্গীকারের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে স্পষ্টভাবে। তাঁর উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সমাজের পিছিয়ে পড়া সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সর্বাধিক সুবিধা দিয়ে উন্নয়নের মূল ধারায় নিয়ে আসা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবো।” গ্রাম হবে শহর- কথাটির মর্মার্থ না বুঝে অনেকে ভেবেছেন দেশের সকল গ্রামকে বুঝি শহর বানানো হবে! মজার বিষয় হলো, নির্বাচনী ইশতেহারে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে আধুনিক গ্রাম নির্মাণের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রাম বাংলার ভূপ্রাকৃতিক বিন্যাস ও নৈসর্গিক বৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে, গ্রামের স্বকীয়তা বজায় রেখে শহরের সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রামেই যাতে পাওয়া যায় সে ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। নদীনালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর, গাছপালা, বনবাদাড়, তরু, লতাগুল্ম, দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, খেতখামার, বনবীথি সব ঠিক রেখেই গড়ে তুলা হবে পরিবেশবান্ধব আধুনিক বাংলাদেশ। অস্বীকার করার উপায় নাই যে, গ্রাম হচ্ছে বাংলাদেশে প্রাণ। তাই গ্রাম বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ।

পঞ্চগড়ের সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ রূপকল্প স্থানীয় পর্যায়ে আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। প্রশ্ন হচ্ছে কী থাকবে আধুনিক গ্রামে? উন্নত রাস্তঘাট, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা ও সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, কম্পিউটার ও দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মানসম্পন্ন ভোগ্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক শহরের সকল সুবিধাদি দেয়ার ব্যবস্থা করতে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করবো আমরা। চিরায়ত গ্রাম বাংলার সকল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখেই আমার গ্রাম হবে শহর।

(৪) তারুণ্যের শক্তি, পঞ্চগড়ের সমৃদ্ধি:

যেকোনো দেশের জন্যই যুব সমাজ বা তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ কথাটি জেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ তরুণ-তরুণী। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান শক্তি হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর দিন বদলের সনদ-রূপকল্প-২০২১ ঘোষণার সময় তিনি তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই তরুণ প্রজন্মকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল এবং উৎপাদনমুখী করে তুলতে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা চাই পঞ্চগড়ের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে এ অঞ্চলের যুব সমাজ। যুব সমাজকে সেইভাবে আমরা প্রস্তুত করতে চাই। তারা যেন আগামী দিনে শুধু পঞ্চগড়কেই নয় পুরো দেশকে পথ দেখাতে পারে সেভাবেই তাদের তৈরি করতে চাই আমরা। তরুণ সমাজের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, তাদের ক্ষমতায়নের দিকে আমরা বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে চাই। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকমুক্ত পঞ্চগড় আমরা গড়ে তুলতে চাই। পঞ্চগড়ের সমৃদ্ধির জন্য আমাদের প্রতিটি কর্মসূচিতে নিউক্লিয়াস হিসেবে থাকবে তরুণ প্রজন্ম। (৫) পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে টেকসই উন্নয়ন: টেকসই উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলার আগে উন্নয়ন প্রসঙ্গে দুটো কথা বলা প্রয়োজন। যুগ যুগ ধরে আমরা জেনে আসছি উন্নয়ন মানেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আমরা ধরেই নেই বড় বড় ইমারত নির্মাণ, কল-কারখানা প্রতিষ্ঠা, রাস্তাঘাট-ব্রিজ নির্মাণ হয়েছে মানে দেশে উন্নয়ন হয়েছে। দাতাগোষ্ঠী, উন্নয়ন সহযোগীসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠান আমাদের এটাই শিখিয়ে এসেছেন। আমাদের উন্নয়ন দর্শন হওয়া উচিত আমাদের মত করে, যেমনটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলে গেছেন এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা বাস্তবায়ন করে চলেছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের দেশে বড় বড় অবকাঠামো তৈরি হয়েছে কিন্তু প্রতিটি নির্মাণের পেছনে রয়েছে যৌক্তিক কারণ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অবকাঠামো উন্নয়ন নিছক লোক দেখানোর জন্য ছিলনা, এগুলো মানুষের জীবনে কতটুকু ভ্যালু অ্যাড করছে, মানুষের মধ্যে কতটুকু বৈষম্য হ্রাস করছে, দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ ক্ষতি করছে কিনা ইত্যাদি বিষয় ছিল প্রধান বিবেচ্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেকসই উন্নয়ন চিন্তা বা দর্শনের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে এমন একটা উন্নয়ন যা বর্তমান জনসংখ্যার সার্বিক চাহিদাই শুধু মেটাবে না, এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন মেটাতেও সমর্থ হবে। টেকসই উন্নয়নের সাথে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের বিষয়টিও ভীষণভাবে জড়িত। এ বিষয়টি বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবা’র চাহিদা বাড়তে থাকে। তখন প্রয়োজন হয় দ্রুত উন্নয়নের। দ্রুত উন্নয়নের জন্য প্রচুর নির্মাণকাজ, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের প্রয়োজন হয়, যার প্রতিকূল প্রভাব পড়ে নদী, বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্যসহ সার্বিক পরিবেশের ওপর পড়ে। আমরা অবশ্যই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালু রাখবো তবে সেটি হবে পরিকল্পিত এবং পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে। ‘স্বপ্নের পঞ্চগড়’-এক গড়তে আমাদের স্বপ্ন, অঙ্গীকার, অগ্রাধিকার ও কর্মসূচি: প্রতিটি মানুষ স্বপ্ন দেখেন। এই স্বপ্নই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, সামনে এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা দেয়। একজন ব্যক্তির যেমন স্বপ্ন থাকে তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান বা দেশেরও স্বপ্ন থাকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের চোখে সোনার বাংলা’র স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিলেন। তাঁর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার আধুনিক রূপ ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করে সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন আর অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তিনি ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং সেই অনুসারে রূপকল্প তুলে ধরেছেন। সেই আলোকে, আমরা পঞ্চগড়বাসী জনতা স্বপ্ন দেখেছি। আমাদের সেই স্বপ্ন ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের অঙ্গীকার এবং ১০টি অগ্রাধিকার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। (১) জ্ঞান-দক্ষতা-প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান এবং ব্যক্তির অন্তর্নিহিত শক্তি বিকাশ উপযোগী শিক্ষা: শিক্ষা এবং শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে আমরা একটু অন্যভাবে দেখতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি শিক্ষার কাজ হওয়া উচিত একজন ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশে উৎসাহ দেয়া এবং সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য সকল প্রকারের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা। খুব সহজ করা বলা যায়, জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। বই মুখস্ত করা, পরীক্ষা দেয়া এবং পাস করে সার্টিফিকেট পাওয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়না। শিক্ষা লাভের প্রক্রিয়াটি কখনই সাময়িক নয়। শিক্ষা লাভ এবং দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি নিরন্তর চলতে থাকা উচিত বলেই আমরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রচলিত শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নমূলক, কর্মসংস্থানমূলক, বৃত্তিমূলক, দেহ ও মনের সুষ্ঠু বিকাশ উপযোগী, আত্মপ্রকাশের দক্ষতা বৃদ্ধি, অন্তর্নিহিত ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো, দেশপ্রেম জাগ্রত করা, উচ্চতর আদর্শ জাগ্রত করা, নেতৃত্ব গুণের বিকাশ করা, চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে চাই আমরা। যে শিক্ষা আমাদের মূল্যবোধ তৈরি করেনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে শেখায়না, দেশকে ভালবাসতে শেখায়না, অসাম্প্রদায়িক মনন তৈরিতে ভূমিকা রাখেনা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ ও চর্চা করতে উদ্বুদ্ধ করেনা সে শিক্ষা কখনওই আমাদের সমাজকে, দেশকে পথ দেখাতে পারেনা। আমাদের সামনে এক বিরাট সুযোগ হচ্ছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হচ্ছে একটি দেশের জনসংখ্যার বয়স চিত্রের তারতম্য, যা জন্মহার ও মৃত্যুহার হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে ঘটে থাকে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অনুযায়ী একটি দেশের মোট জনসংখ্যার ১৫-৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষদের কর্মক্ষম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরা কাজের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে যোগ্য। অন্যদিকে ১৪ বছরের নিচে এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে যারা আছেন তাদের কর্মক্ষম তালিকার বাইরে। একটি দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কর্মক্ষম নন এমন মানুষের সংখ্যার চেয়ে বেশি হলে তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। বর্তমানে আমাদের দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে ২০৪০ সাল পর্যন্ত আমরা এই সুবিধা নিতে পারবো। কাজেই আমাদের সামনে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের বিকল্প নেই। যারা চাকুরি প্রত্যাশী এবং যারা চাকুরি করছেন তাদের উভয়ের জন্য একথা সমানভাবে প্রযোজ্য। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার, ছাত্র-ছাত্রীর সমতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, ঝরে পড়ার হার দ্রুত কমিয়ে আনা, শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নসহ শিক্ষার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখন একটি রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। দেশের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক এবং অনগ্রসর অঞ্চলের মানুষের জন্যেও সরকার শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দেশের বর্তমান সাক্ষরতার হার ৭৫.৬০ শতাংশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের জেলা পঞ্চগড়ের সাক্ষরতার হার মাত্র ৫১.০৮% (পুরুষ ৫৫.২০%, মহিলা ৪৮.৩০%)। শুধু সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি করেই নয়, এ অঞ্চলের প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষকে সত্যিকারের মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং অঙ্গীকার রয়েছে যা তুলে ধরা হলো: ক) সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি: আগেই উল্লেখ করেছি পঞ্চগড় জেলার সাক্ষরতার হার মাত্র ৫১.০৮% (পুরুষ ৫৫.২০%, মহিলা ৪৮.৩০%) যা দেশের গড় সাক্ষরতার হারের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ কম। আমাদের অঙ্গীকার, আমরা আগামী ৫ বছরের মধ্যে পঞ্চগড়ের সাক্ষরতার হার দেশের গড় সাক্ষরতার হারের (৭৫.৬০ শতাংশ) সমান পর্যায়ে নিয়ে যাবো। আমরা সকল শিশুদের স্কুলে ভর্তি হওয়া এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার দ্রুত কমিয়ে আনতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিবো। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত স্কুল এবং স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে পাড়া ও মহল্লায় বিভিন্ন পেশা ও বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষদের জন্য পড়ালেখার (প্রয়োজনে নাইট স্কুল চালু করা) ব্যবস্থা করবো আমরা। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি। সেই জন্য যেসব স্কুলে মিড-ডে মিল চালু আছে সেগুলো আরও জোরদার করা হবে এবং যেখানে চালু নেই সেখানে চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। খ) কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: কারিগরি শিক্ষা নিয়ে আমাদের সমাজে বেশকিছু ভুল ধারণা চালু রয়েছে। অনেকে মনে করেন, যেসব ছেলে-মেয়েদের পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি কম এবং যারা ‘খারাপ ছাত্র’ তারাই কারিগরি শিক্ষার দিকে ঝুঁকে থাকে। এমনকি দেশের শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধিরাও এমন ভুল ধারণা পোষণ করে থাকেন। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে দারিদ্র বিমোচন, কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, আত্ম-কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে কেবল কারিগরি ধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সকল শিক্ষার্থীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে বর্তমান সরকার প্রতিটি সাধারণ ধারার বিদ্যালয়ে কমপক্ষে দুটি বৃত্তিমূলক ট্রেড চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমরা পঞ্চগড়ে ব্যাপকভিত্তিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ করতে চাই। এজন্য সবার আগে দরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং সামাজিকভাবে এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে জনগণকে সচেতন করে তোলা। সাধারণ শিক্ষার প্রয়োজন ও গুরুত্ব দুটোই আছে, কিন্তু আমাদের দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ ডিগ্রিধারী বের হয় তার তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারিনি আমরা। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করলে কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তা করতে হয়না। বর্তমানে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছি। আমাদের বাস্তবতায় অল্প সময়ের মধ্যে বড় বড় শিল্প কারখানা স্থাপন সম্ভব নয়, তাই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে পঞ্চগড়ের তরুণ-তরুণীদের কাজের উপযোগী করে গড়ে তুলতে চাই। পঞ্চগড়ের মোট জনসংখ্যার ৫৭ ভাগের বয়স ৩০ এর নিচে। এদের একটা অংশ এখনও কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছে। আরেকটি অংশ রয়েছে যারা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছিটকে পড়েছে অথবা পড়াশুনা শেষ করে বেকার রয়েছে। তারা কমবেশি সবাই কর্মক্ষম। এই তরুণদের জন্য আমরা ব্যাগ তৈরি, কাগজ দিয়ে ফুল তৈরি, হস্তশিল্প, চামড়া শিল্প, পোশাক তৈরি, স্ক্রিন প্রিন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের কাজ, মোবাইল মেরামত, টেলিভিশন মেরামত, কম্পিউটার মেরামত, ফ্রিজ মেরামত, এয়ারকুলার মেরামত এবং কম্পিউটারের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করতে চাই। এছাড়া কৃষি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতসহ নানা ট্রেডে, উন্নত জাতের পশু পালন, পশু প্রজনন, পশু চিকিৎস্য ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিবো। কোন সেক্টরের জন্য কত মানুষ দরকার সে বিষয়ে জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ এবং ডাটা সায়েন্স ব্যবহার করে আমরা বিষয়গুলো এগিয়ে নিতে চাই। সবাইকে একটি বা দুটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ না দিয়ে বর্তমান চাহিদা এবং আগামী দিনের চাহিদা নিরূপণের মাধ্যমে আমরা কাজ করতে চাই। অন্যদিকে, যারা এখনও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছে তাদের জন্যও স্বল্প পরিসরে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। সাধারণ শিক্ষা বা পাঠদান কর্মসূচির পাশপাশি এটি চলতে থাকবে। শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা এবং আগ্রহর উপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এছাড়া গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, কাঠমিস্ত্রী, রাজমিস্ত্রী, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, স্যানিটারি ফিটিংস মিস্ত্রীদের বিদ্যমান দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের আরও বেশি উপার্জনক্ষম করে তুলতে চাই। তাদের এই দক্ষতা দিয়ে তারা শুধু দেশেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে পারবেন। অদক্ষ, আধা-দক্ষদের চেয়ে দক্ষ শ্রমিক অনেকগুণ বেশি আয় করতে পারবেন। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে বিদেশ গিয়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ কম। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ভাষাগত সমস্যা এবং দক্ষতার অভাব। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার হয় এমন ভাষা এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তাদের বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতে সবসময় দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের চাহিদার ভিত্তিতে আমরা পঞ্চগড়েই আগ্রহী তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করবো। পোশাক কারখানা প্রশিক্ষকগণ পঞ্চগড়ে এসে তাদের চাহিদামত স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিবেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ঢাকায় চাকুরীর ব্যবস্থা করবেন। এরফলে পোশাক কারখানাগুলো যেমন দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী পাবেন তেমনি আমাদের ছেলে-মেয়েদের কর্মসংস্থান হবে। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের জন্যই নয়, আগামী দিনে যেসব দক্ষতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি হবে সেসব সেক্টরেও এমন উদ্যোগ নেয়া হবে। গ) মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ: বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আসে কওমী মাদ্রাসা এবং আলিয়া মাদ্রাসা থেকে। কওমি মাদ্রাসার বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই বিশ্বাস করে, তাদের অর্জিত শিক্ষা ইহকালের জন্য নয়, পরকালের জন্য। তাদের কর্মজীবন তাই ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মপ্রচার ও ধর্মীয় আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাই, তাই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থীদের তুলনায় তাদের চাকরিক্ষেত্র অনেকটাই সংকীর্ণ। কওমি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন মসজিদে ইমাম, মুয়াজ্জিম বা খাদেম হিসেবে কিংবা বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কাজ করার উদাহরণই বেশি। তবে ধর্মভিত্তিক এসব কাজে বেতন-ভাতা অত্যন্ত কম হওয়ায় তাদের অনেকেই আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। অন্যদিকে, আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ধর্মভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি মূল ধারার শিক্ষাব্যবস্থার কিছু কিছু বিষয় পড়ানো হয়। ফলে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের তুলনায় আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের চাকরির ক্ষেত্র খানিকটা বিস্তৃত, তবে তা মূলধারার শিক্ষার্থীদের সমান নয়। বাইরে থেকে কেউ পরিস্থিতি বদলে দেবে এমন অপেক্ষায় আমরা বসে থাকতে পারিনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কি সারাজীবন শুধু ওয়াজ মাহফিল এবং মিলাদ পড়ানোর কাজ করবে? মোটেও না। আরবী পড়তে জানা, বলতে জানা এবং লিখতে জানা শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযুক্ত কাজের সাথে যুক্ত করতে চাই। বর্তমানে সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা ১ কোটির বেশি যার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। আরবী জানা ছেলে মেয়েদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পাঠানো হলে তারা অন্যান্য শ্রমিকদের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ উপার্জন করতে পারবে। এমন কর্মসূচি আমরা পঞ্চগড়ের মাটিতে শুরু করতে চাই। এটাই আমাদের অঙ্গীকার। সারা বিশ্ব আজ একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। দেশ ও কালের সীমানা ভেঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি সারা বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করার জন্য যে শুধু বিদেশ যেতে হবে এমনটি কিন্তু নয়। ইউরোপ, আমেরিকার মত উন্নত দেশগুলো তাদের অনেক কাজ বাংলাদেশ, ভারত, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে আউটসোর্স করে দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, আমেরিকার একজন নাগরিক কোনো একটা সেবা’র জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কল সেন্টারে ফোন কল করলেন। কলটি রিসিভ করলেন একজন বাংলাদেশী বাঙ্গালী তাও আবার বাংলাদেশে বসে। আমাদের জেলার কওমী ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের কল সেন্টারে কাজ করার উপযোগী করে তুলবো। ফলে, এরা পঞ্চগড়ে বসে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটা প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করবে। বিশ্বজুড়ে এই সেক্টরের অপার সম্ভাবনা আমরা কাছে লাগাতে চাই। এটাই আমাদের স্বপ্ন। ঘ) সময়োপযোগী সাধারণ শিক্ষা: আগেই বলা হয়েছে বই মুখস্ত করা, পরীক্ষা দেয়া এবং সনদ পাওয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়না। শিক্ষা লাভ এবং দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি নিরন্তর চলতে থাকে। সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলে যায়। এই বদলে যাওয়ার যাবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বা শিক্ষা পদ্ধতিকেও বদলাতে হয়। শিক্ষা ব্যবস্থা এতো ঘন ঘন এবং দ্রুত বদলে দেয়ার মত বাস্তবতা নেই। তাই বলে কি নতুন বিষয় আত্মস্থ করা বা শেখা’র কাজ থাকবে? মোটেও না। সময়ের চাহিদা বিবেচনায় আমরা সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও স্বল্প পরিসরে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রাখতে চাই। এর জন্য যেমন নতুন অবকাঠামো, নতুন শিক্ষকের প্রয়োজন হবেনা তেমনি খরচের জন্য সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকতে হবেনা। বিষয়টি আরও সহজ করে উপস্থাপন করা যেতে পারে। এটা সকলের জানা যে, আমাদের এই অঞ্চলের তরুণরা শারীরিকভাবে এগিয়ে থাকার কারণে আনসার, পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে চাকুরির জন্য এগিয়ে থাকে। সামান্য পরিকল্পনা ও চেষ্টায় আমরা এই সংখ্যাটি কয়েকগুণ বাড়িয়ে নিতে পারি। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ম করে শারীরিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে চাই আমরা। এর ফলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সুন্দর আগামী প্রজন্ম গড়ে উঠবে। গর্বের বিষয় হচ্ছে, ক্রীড়াক্ষেত্রে বিশেষত মেয়েদের ক্রীড়াঙ্গনে জাতীয়ভাবে বিরাট অবদান রেখে আসছে আমাদের মেয়েরা। আমরা জানি মেয়েদের হ্যান্ডবল, কাবাডি, ভলিবল ও তায়কন্দ-এ জাতীয় দলে নেতৃত্ব দিচ্ছে কাজী সাহাবউদ্দিন বিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্রীরা। পেশাদার খেলোয়াড় হওয়ার জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা যেমন অনুশীলনের সুযোগ, পর্যাপ্ত খাবার, খেলার মাঠ, অবকাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আমরা দিতে পারছিনা। এরফলে অনেক দেশ অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আমরা প্রতিটি বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করবো এবং সত্যিকারে পরিবর্তন নিয়ে আসবো ইনশাল্লাহ। ঙ) ব্যক্তিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জীবনধারামূলক শিক্ষা: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা গড়ে তোলা। বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য সোনার মানুষ গড়ে তোলার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন। শিক্ষার মাধ্যমে আমরা সোনার মানুষ গড়ে তুলতে চাই। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ভাল ফলাফল করা, বড় চাকুরি পাওয়া এবং নিজেকে গুটিয়ে নেয়া নয়। শিক্ষা মানুষের সুস্থ দেহ ও সুস্থ মন গড়ে তুলবে, আত্মিক বিকাশ ঘটাবে, উচ্চতর আদর্শ জাগ্রত করবে, দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলবে, আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে, উন্নত মূল্যবোধ অর্জন ও চর্চা এবং সার্বিক নৈতিক আচরণে অভ্যস্ত করে তুলবে। একজন জ্ঞানী ও বিদ্বান মানুষ যদি সৎ, দেশপ্রেমিক, উন্নত নৈতিক চরিত্রের আধিকারী না হয়ে থাকেন তবে তার মত বিদ্বান ব্যাক্তি সমাজের জন্য মঙ্গলজনক নয়, বরং ক্ষতিকর এবং পরিত্যাজ্য। মানুষ সামাজিব জীব। সামাজিক জীব হওয়ার কারণে মানুষ দলবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারে এবং বড় লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। এই বৈশিষ্ট্য বা গুণের কারণে মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা এবং উন্নত। সমাজে বসবাস করতে হলে মানুষকে কতগুলো সামাজিক দক্ষতা অর্জন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হবার কারণে মানুষ তার সামাজিক দক্ষতা হারিয়ে ফেলছে, ফলে সমাজে একজনের বিচ্ছিন্নতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমাজে সকলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য সমাজের অন্য সদস্যদের সাথে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক স্থাপন, নৈতিক ও আচরণগত জ্ঞান, সাংস্কৃতিক জ্ঞান, সমাজ সচেতনতা ইত্যাদি বিশেষভাবে জরুরি। নির্দিষ্ট সমাজে বা দেশে বসবাসরত মানুষদের আচার-আচরণ, আদর্শ, জ্ঞান, কলাকৌশল, দক্ষতা, ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস, অভ্যেস ইত্যাদির সমষ্টিকে সংস্কৃতি বলে। সংস্কৃতি হলো সমাজবদ্ধ মানুষের পরিপূর্ণ জীবনচিত্র। সংস্কৃতি একটি সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা একটি সমাজের শেকড় হিসেবে কাজ করে। নিজস্ব সংস্কৃতি অবহেলা বা অবজ্ঞা করে কোনো ব্যক্তি, সমাজ এমনকি দেশের পক্ষে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই আমরা বর্তমান প্রজন্ম এবং আগামী প্রজন্মকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বিষয়ে অবগত করে, আমাদের সংস্কৃতির কল্যাণকর উপাদানগুলো চর্চা এবং অকল্যাণকর বিষয় বর্জন করার মাধ্যমে ব্যক্তিকে মার্জিত ও রুচিশীল হিসেবে গড়ে তুলতে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চাই। শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো মানুষকে পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপনের পদ্ধতি ও রাস্তা সম্পর্কে ধারণা দেয়া। সঠিক শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে মাধ্যমে মানুষ সঠিকভাবে জীবনধারণ ও জীবনধারণের সঠিক পদ্ধতি খোঁজ পেতে সক্ষম হয়। সারা দুনিয়া প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে এবং একেক সময় একেক রকম বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিয়ে কীভাবে জীবনধারা চালু রাখতে হবে সেটাও মানুষকে শেখাতে চাই আমরা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত কয়েক দশকে করোনা মহামারির মত বড় দুর্যোগ আমরা মোকাবেলা করিনি। সম্পূর্ণ নতুন এই পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হবে সে শিক্ষাটা আমরা সমাজ থেকেই পেয়েছি। আমরা এই শিক্ষাটা আরও উন্নত করতে চাই। দেশ-বিদেশের গুণীজনেরা বলে থাকেন প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা নষ্ট করে দিচ্ছে। এই বিষয়টি আমরা বিশেষভাবে লক্ষ্য মনিটর করতে চাই। শিক্ষার জন্য অবকাঠামো: দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে যেসব অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাই: * একটি মেডিকেল কলেজ ও একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে পঞ্চগড় ছাড়াও সারাদেশের তরুণ-তরুণীরা এমনকি প্রতিবেশী দেশ নেপাল এবং ভারতের শিলিগুড়ি থেকে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করবে; * এ অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের দেশ-বিদেশের কল-কারখানায় কাজের উপযোগী এবং দক্ষ হিসেবে প্রস্তুত করতে পঞ্চগড়ে নির্মাণ করা হবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়; * বেশ লম্বা সময় থেকেই পঞ্চগড়ের মেয়েরা জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াঙ্গনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা নতুন নতুন খেলোয়াড় খুঁজে বের করতে এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের প্রস্তুত করতে চাই। সেই লক্ষে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া শিক্ষা/প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে পঞ্চগড়ের তরুণ-তরুণী ক্রীড়াবিদদের বিকাশের সম্ভাবনাকে প্রসারিত করতে চাই; * পঞ্চগড়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে কম্পিউটার (শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব) ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে চাই যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে মৌলিক ধারণা নিয়ে বের হতে পারে; * পঞ্চগড়ে একটা হাইটেক পার্ক/আইটি ভিলেজ এখন সময়ের দাবি। হাইটেক পার্ক/আইটি ভিলেজ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তরুণ-তরুণীরা নিজ জেলায় বসে কাজ করার পাশাপাশি বিদেশেরও কাজ করতে পারবে; ২। কৃষিপণ্য ও কৃষিশিল্প বহুমুখীকরণ: আমাদের পঞ্চগড়ের কৃষকরাই হচ্ছেন আমাদের প্রকৃত হিরো। নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে কৃষকরা আমাদের আগলে রেখেছেন। পঞ্চগড়ের কৃষক ভাইবোনদের নিয়ে আমরা এই অঞ্চলের কৃষিকে নতুনভাবে সাজাতে চাই। দানাশস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা যতটা সফল হয়েছি সবজি, ফলমূল ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা সেভাবে সফলতা পাইনি। তবে আশার কথা হচ্ছে যে, আমাদের সবজি ও ফলমূল উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে তবে এখনো চাহিদার তুলনায় বেশ কম। ডাল, তেল ও মসলা ফসল উৎপাদন খানিক বাড়লেও আমরা এখনও এসব ক্ষেত্রে বেশ পরনির্ভরশীল। ডালজাতীয় ফসলে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে আরো বহুদূর। এ বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। পঞ্চগড়ে প্রচুর পরিমাণে তিল ও পান উৎপন্ন হয় এবং আমরা এগুলো রপ্তানি করি। বাজারজাতকরণের সঠিক চ্যানেল না থাকায় কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। আমি এ এলাকার কৃষকদের সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, সামান্য সুযোগ-সুবিধা দিতে পারলেই কৃষি এবং কৃষিপণ্য হতে পারে পঞ্চগড়ের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। আমরা কৃষকদের জন্য একটা সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই। ইতোমধ্যে আমরা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে হাড়িভাসা ইউনিয়নের পানের বরজ পরিদর্শন করিয়েছি এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণের ব্যবস্থা করেছে। সামান্য সহযোগীতে তাদের অনেক দূর এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে বলে মনে করেন পানচাষিরা। কৃষকরা যাতে তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য বিশেষ করে পান, তিল, টমেটো বাড়ির কাছে স্থলবন্দরের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশে রপ্তানি করতে পারেন সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে চাই আমরা। আমাদের বিশ্বাস এসব কৃষি পণ্যের রপ্তানি আয় পাল্টে দেবে পঞ্চগড়ের অর্থনীতি এবং মানুষের জীবন যাত্রার মান। টমেটো সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে অব্যবস্থার কারণে আমাদের টমেটোচাষীদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। সংবাদপত্রে ও টেলিভিশনে আমরা দেখেছি পঞ্চগড়ের টমেটোচাষীরা তাদের টমেটো রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। এমন দৃশ্য আর দেখতে চাইনা আমরা। সংরক্ষণের জন্য হিমাগার এবং বাজারজাতের জন্য যথাযথ চ্যানেল তৈরি করতে চাই আমরা। পঞ্চগড়েই কোন কৃষকই যেন তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত না হয় সে বিষয়টির স্থায়ী সমাধান করতে চাই আমরা। পঞ্চগড়ের চায়ের উৎকৃষ্ট মানের কারণে দেশব্যাপী এর চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তার ফসল পঞ্চগড়ের সমতলে চা চাষ। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পঞ্চগড় সফরে আসেন। সফরে এসে পঞ্চগড়ের পার্শ্ববর্তী ভারতীয় সীমান্তজুড়ে চায়ের বাগান ও ভারতের দার্জিলিংয়ে চায়ের বিষয়ে কথা বলার ফাঁকে পঞ্চগড়ে চা চাষের সম্ভাব্যতা নিয়ে কথা হয় তৎকালীন জেলা প্রশাসক রবিউল ইসলামের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে জেলায় ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি বিশেষজ্ঞ দল উত্তরাঞ্চল সফর করেন। সেই থেকে শুরু। বাংলাদেশে সমতলভূমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কেবল মাত্র এই জেলাতেই চা চাষ হচ্ছে। ইতোমধ্যে চা চাষ জেলার কৃষিতে একটি বড় জায়গা করে নিয়েছে। বর্তমানে জেলার আনাচে কানাচেই চোখে পড়ে সবুজে ঘেরা অসংখ্য চা বাগান। বর্তমানে চা চাষিদের বহুমুখী সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রভাবশালী মহলের আধিপত্যে ছোট ছোট বাগানমালিককে বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আমরা চা চাষিদের নিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করবো। সাম্প্রতিক সময়ে পঞ্চগড় জেলার কৃষকগণ বহুমুখী চাষের মাধ্যমে আশার আলো দেখাচ্ছেন। এর মধ্যে সুপারি, মরিচ, পেঁপে, মাল্টা ও কমলা চাষ এবং একই জমিতে পেঁপে ও মাল্টার সমন্বিত চাষ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া গ্রীষ্মকালে আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর মাঠ দেখলে মনে হয় কে যেন সবুজ মাঠের উপর একটা লাল চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। পঞ্চগড়ে স্থানীয় জাতের পাশাপাশি বাঁশগাইয়া, মল্লিকা, বিন্দু, হট মাস্টার, সুরক্ষাসহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের মরিচের আবাদ আমাদের দারুণভাবে আশাবাদী করে তুলেছে। মসলা ফসলের ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তেল ফসলের ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীলতা খানিক কমলেও এখনও আমদানি করতে হয় প্রচুর পরিমাণ তেল। তাছাড়া সরষের তেলের গুণমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বেশ পিছিয়ে রয়েছি আমরা। ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে যথেষ্ট, বেড়েছে আমাদের আলুর উৎপাদনও। তবে আলুর উৎপাদন খানিক কমলেও ক্ষতি নেই বরং সেখানে আবাদ করা সম্ভব হবে অন্যান্য কিছু ফসল। কৃষিশিল্পের উন্নয়নের সমান তালে আমাদের কমলা চাষ, পাথর শিল্প ও বালু শিল্পের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের মাধ্যমে পঞ্চগড়ের উন্নয়ন অধিকতর সহজ করে তোলা যায়। এ কারণে আমরা পঞ্চগড়ে গড়ে তুলতে চাই একটি সুনির্দিষ্ট শিল্প অঞ্চল। যদিও জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট নানা কারণে জেলার পরিবেশ আজ কিছুটা হুমকির মুখে। এই জেলার মিঠা পানির মাছ খুবই সুস্বাদু। কিন্তু প্রধান নদীগুলােেত বাঁধ দিয়ে ভারত পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করায় ৩২টি নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। মানচিত্র থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে ভেরসা, ডাহুকসহ বেশকটি আঞ্চলিক নদী। কৃষক অধিক লাভের আশায় জমিতে প্রয়োগ করছেন মাত্রাতিরিক্ত সার-কীটনাশক। এ জন্য হারিয়ে যেতে বসেছে জীববৈচিত্র্য। পঞ্চগড়ের পরিবেশ ও প্রকৃতি বাঁচানারে জন্য দ্রুত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ দরকার বলে মত প্রকাশ করেন এ অঞ্চলের কৃষক এবং সচেতন নাগরিকগণ। বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চলের কৃষির জন্য বীজ একটা বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন বা সার্বভৌমত্ব কৃষির বহুমুখীকরণ, বীজ সংরক্ষণে বীজব্যাংক, উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল উৎপাদন, কৃষি গবেষণা, কৃষক সংগঠন, কৃষি ঋণ, কৃষি বীমা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ-ভিডিও কন্টেন্ট, প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাজারের সাথে যুক্ত করে দেয়া ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করতে চাই। ৩। পঞ্চগড়কে বহুমাত্রিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলা: পঞ্চগড় বাংলাদেশের একটি প্রাচীন জনপদ। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শেষ প্রান্তে প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযের লীলাভূমি পঞ্চগড় জেলা। বৃটিশ শাসনামলে এ জেলাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত ছিল। পঞ্চগড় জেলার তিনদিকেই ১৮৩ মাইল বেষ্টিত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। এ জেলার উত্তরে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি, দক্ষিণে ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর জেলা, পূর্বে নীলফামারী জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের উত্তর দিনাজপুর অবস্থিত। করতোয়া, ডাহুক, মহানন্দা, তালমা, পাঙ্গা এবং চাওয়াই নদী ছাড়াও এ জেলায় অনেক পাহাড়ী নদী রয়েছে। হিমালয় অঞ্চলের শৈত্য প্রবাহের কারণে এ অঞ্চলে শীতের তীব্রতা খুব বেশী। তবে অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে আকাশ পরিষ্কার থাকলে তেঁতুলিয়া থেকে পৃথিবীর তৃতীয় সর্বচ্চো শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা অবলোকন করা যায়। এ অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। হিন্দু ও মুসলিম ছাড়াও এ জনপদে রয়েছে রাজবংশী, কোচ, পলিয়া, সাঁওতাল, ওঁরাও এবং সুনরীদের জনবসতি। এই প্রাচীন জনপদে রয়েছে ইতিহাসের নানা সাক্ষী নিয়ে ঠিকে থাকা দর্শনীয় নিদর্শন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই পঞ্চগড় জেলার নানা দর্শনীয় স্থান ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছে টেনে নেয়। একটি শহরকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যে যে উপাদান প্রয়োজন তার সবই বিদ্যমান রয়েছে পঞ্চগড় জেলায়। দর্শনীয় স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ক) ভিতরগড় খ) মহারাজার দিঘী গ) বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির ঘ) মির্জাপুর শাহী মসজিদ ঙ) বার আউলিয়া মাজার চ) গোলকধাম মন্দির ছ) তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো জ) বাংলাবান্ধা জিরো (০) পয়েন্ট ও বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর ঝ) সমতল ভূমিতে চা বাগান ঞ) রকস মিউজিয়াম। দর্শনীয় স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলতে চাই বিনোদন ও পর্যটন নগরী। এ উপমহাদেশের পর্যটন কেন্দ্র নেপাল, ভুটান ও দার্জিলিং এর সাথে পঞ্চগড়কে যুক্ত করে আমরা গড়ে তুলতে চাই বিশেষ ‘পর্যটন হাব’। জেলা পরিষদের হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর পঞ্চগড়ে ৫০ হাজার পর্যটককের সমাগম ঘটে। সামান্য চেষ্টায় এই সংখ্যাকে দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণ করা সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটন (দেশের মধ্যে) উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা বা সুযোগটিকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, পর্যটক আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি আমাদের রয়েই গেছে। পর্যটকদের জন্য থাকা, খাওয়া, বিনোদনের সুযোগ এবং অবশ্যই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে আমাদের। এসব অবকাঠামো বা সুবিধা রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয় তাই আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারি উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক গাড়ি সেবাদানকারী উবার (Uber) বা আবাসন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এয়ার বিএনবি (Air BnB) -এর কথা বলা যায়। প্রতিষ্ঠান দুটির নিজস্ব গাড়ি বা বাড়ি নেই। স্থানীয়ভাবে তারা গাড়ি বা বাড়ি সংগ্রহ করে ব্যবসা করে থাকে। পঞ্চগড়ে আমরা এমন মডেল নিয়ে কাজ করতে চাই। পঞ্চগড়ের ইকো টুরিজমের টানে দেশ-বিদেশের পর্যটক এখানে আসবেন। টাকার বিনিময়ে স্থানীয় মানুষের অব্যহৃত ঘরে বা বাড়িতে থাকবেন এবং তাদের সাথে খাবেন। এতে দুপক্ষই লাভবান হবে এবং সরকারের নতুন নতুন অবকাঠামো গড়ে ভালো লাগবেনা। হোয়াংহো নদী একসময় ‘চায়নার দুঃখ’ পরিচিত ছিল। কিন্তু আজ হোয়াংহো তাদের সম্পদে পরিণত হয়েছে এবং পর্যটকদের তীর্থ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ঠিক একইভাবে আমরা করতোয়াকে গড়ে তুলতে চাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে। স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ঐতিহ্য পর্যটকদের বরাবর আকৃষ্ট করে। আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য পর্যটকদের হতাশ করবেনা বলেই আমাদের বিশ্বাস। যত্ন ও সংরক্ষণের অভাবে আমাদের অনেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং মূল্যবান সাংস্কৃতিক উপাদান হারিয়ে যেতে বসেছে। যে কোনো মূল্যে আমাদের পঞ্চগড়ের হুলির ধাম, পালাগান, কুয়ালির গান (গায়োল ঘরে বিশেষ গান), বিয়ের গীত ইত্যাদি আমরা রক্ষা করতে চাই, বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আমাদের বিশেষ খাবার যেমন সিদল, পেলকা, সেলকা, রাশা, লাফা শাকের কাঞ্জি ইত্যাদি আমরা কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেবনা। গ্রামীণ ই-কমার্সের মাধ্যমে এসব ঐতিহ্য আমরা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। একদিন পঞ্চগড়ে পর্যটকদের গুরুত্বপূর্ণ ভালোলাগার উপাদান হবে আমাদের এসব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দ্রুত শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, কল কারখানা, গ্যাস-বিদ্যুৎ ইত্যাদি সুযোগ সুবিধা আপাতত আমাদের নেই। এসব অবকাঠামোর জন্য আমাদের লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তাই এই মুহূর্তে আমাদের যা আছে তা নিয়েই আমরা কাজ শুরু করতে চাই। সাধারণ পর্যটনের পাশাপাশি পঞ্চগড়ে কৃষিভিত্তিক পর্যটনের কথাও আমরা ভেবেছি। আমাদের পরিকল্পনা আছে দেশ-বিদেশ থেকে কৃষি বিষয়ের ছাত্র-ছাত্রী, গবেষক এখানে আসবেন, থাকবেন এবং চাষ পদ্ধতি দেখবেন এবং আমাদের কৃষিভিত্তিক পর্যটনকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিবেন। দেশ ও বিদেশের পর্যটকদের আগামনে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে যা পঞ্চগড়ের অর্থনীতিকে সচল করবে। এটা আমাদের সম্মিলিত স্বপ্ন। ৪। পরিকল্পিত এবং কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা: যেকোনো অঞ্চল বা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে উন্নত-কার্যকর পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগ ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক, রেল এবং নৌপথের সমন্বয়ে কার্যকর যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারাদেশে দারুণ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। অন্যান্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে পঞ্চগড় জেলার পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত এবং আধুনিক। একটা সময় রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি পঞ্চগড় আসার একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম ছিল সড়কপথ। রেলপথে আসতে হলে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে দিনাজপুরগামী আন্তনগর ট্রেনে উঠে দিনাজপুর স্টেশনে নেমে পঞ্চগড়গামী গেইটলক বাস ধরে পঞ্চগড় যেতে হতো। সড়কপথে ঢাকা-পঞ্চগড়-ঢাকা যাতায়াত যেমন ব্যয়বহুল তেমনি সময় সাপেক্ষও। বিমান পথে আসতে হলে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর পর্যন্ত বিমানে আসতে হবে তারপর বাসযোগে পঞ্চগড় আসা যাবে। সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি ছিল কল্পনাতীত। জননেত্রী শেখ হাসিনা পঞ্চগড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছেন। ২০১৮ সালের ১০ নভেম্বর থেকে শুরু হয় পঞ্চগড়-ঢাকা-পঞ্চগড় সরাসরি আন্তনগর ট্রেন সার্ভিস। জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তোলা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য যে ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার আমরা সেটাই করবো। পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করা হলে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন মাত্রা পাবে। এর সুফল শুধু পঞ্চগড় জেলার মানুষই উপভোগ করবেন না, পুরো বাংলাদেশ এখান থেকে লাভবান হবে। এ রেলপথটি চালু হলে জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। এতে অর্থনীতির দৃশ্যপট একেবারে পাল্টে যাবে। একই সঙ্গে ভারতের শিলিগুড়ির সঙ্গে রেলপথ যোগাযোগ আরও সহজতর হবে। পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নে আমরা সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে প্রতিবেশী চার দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের দুয়ার খুলে যাবে। সারা দেশের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে পঞ্চগড়ের খনিজ পাথর। গড়ে উঠছে ছোটবড় শিল্প-কারখানা। দেশের নানা প্রান্তের উদ্যোক্তারা এ অঞ্চলে গড়ে তুলছেন শিল্প-প্রতিষ্ঠান। বাংলাবান্ধা-ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পরিবহন চলাচল করে। এই মহাসড়কটি পঞ্চগড় শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়ার ফলে প্রায় যানজট লেগে থাকে। এরফলে শহরের মানুষের চলাচল ব্যহত হয় এবং মালবাহী পরিবহনগুলো নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে যেতে না পাড়ার কারণে তাদের সময় এবং জ্বালানী দুটোরই অপচয় হয়। এছাড়া শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে মূল রাস্তার দুপাশে রয়েছে ৭০/৮০টি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের একটিই রাস্তা। তাই পঞ্চগড় শহরের বাইপাস সড়ক জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা বাইপাস সড়ক তৈরির উদ্যোগ নেব। বাংলাবান্ধা বন্দর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পণ্য সরবরাহ ও পরিবহনের জন্য আমরা বিশেষ অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাই। এই অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে পঞ্চগড় হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সড়কপথ, রেলপথ এবং নৌপথ নির্মাণ এবং মেরামতের দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। তবে এখানে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সড়কপথ, রেলপথ এবং নৌপথকে নিরাপদ রাখা। অতিরিক্ত পণ্য এবং যাত্রী পরিবহন যেমন রাস্তার জন্য ক্ষতিকর তেমনি দুর্ঘটনারও কারণ। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, বড় বড় অবকাঠামো, রাস্তা, ব্রিজ যেন আমাদের স্বজন হারানোর কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে নৌকাডুবিতে ৪০ জনের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেন এবং এরচেয়ে বেশি মানুষ নিখোঁজ হন। এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে সে বিষয়ে আমরা সাধারণ মানুষকে সচেতন ও শিক্ষিত করতে চাই। তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে আমরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে নিয়মিতভাবে এই কাজটি করতে চাই। ৫। ডিজিটাল পঞ্চগড় থেকে স্মার্ট পঞ্চগড়ের পথে যাত্রা: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের যে স্বপ্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দেখিয়েছিলেন সেটি আজ বাস্তবতা। তথ্যপ্রযুক্তিকে আলাদা খাত হিসেবে বিবেচনা না করে বরং সব ক্ষেত্রেই তথ্যপ্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করার ফলেই বাংলাদেশ আজ কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, প্রশাসন, উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ-কর্মসংস্থানসহ প্রায় সব খাতে সমানভাবে উন্নতি করেছে। এরফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে এসেছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং গতিশীলতা। সেই সাথে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকার ও জনপ্রশাসন সম্প‍র্কে আস্থা ফিরে আসছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ মানুষ উন্নত জীবন যাপন করতে পারছেন। পঞ্চগড় জেলা ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অন্যতম অংশীদার। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের সূচনালগ্ন থেকেই আমাদের জেলা একটি ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করে আসছে। পঞ্চগড়ই প্রথম জেলা যার প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়। এখান থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেছি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জমির পর্চা ও ইমিউটেশন প্রদান। আটোয়ারীর ২টি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে ডিজিটাল ভাতা ব্যবস্থাপনা। অফিস-আদালত, ব্যবসাবাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি সমস্ত ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে পঞ্চগড় বাংলাদেশের জেলাগুলারে মধ্যে অন্যতম দৃষ্টান্ত। তরুণরা ঘরে বসে আউট সোর্সিং এর কাজ করছে ইউরোপ আমেরিকার বাজারে। ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির (রূপকল্প-২০২১) সফল বাস্তবায়নের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সামনে নতুন স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছেন। রূপকল্প-২০৪১ অনুযায়ী তিনি ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ আয়ের উন্নত এবং স্মার্ট দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। ইতঃপূর্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে পঞ্চগড় জেলা যেভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, আমাদের বিশ্বাস স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণেও আমরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করবো। ইতঃপূর্বে আমরা বলেছি, পুরো বিশ্ব আজ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। তাই প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে বিশ্ব। বদলের হাওয়া বাংলাদেশের পালেও লেগেছে। সঙ্গত কারণে পঞ্চগড় এর বাইরে নয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান হাতিয়ার হবে শিক্ষা। রূপকল্প-২০৪১-এর কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৪১ সালে • বাংলাদেশের মাথা পিছু আয় হবে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার; • অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৩ তম অর্থনীতির দেশ; • জিডিপিতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অবদান হবে ২০ শতাংশ; • নেতৃত্বদানকারী প্রযুক্তি হবে Future Technology (বর্তমানে নেতৃত্বদানকারী প্রযুক্তি হচ্ছে Emerging Technology); স্মার্ট বাংলাদেশের প্রধান ৩ টি ভিত্তি হচ্ছে: ক) ডিজিটাল সমাজ: সমাজের সকল স্তর ও শ্রেণী-পেশার মানুষকে যুক্ত করার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ এর সম্প্রসারণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি; খ) জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি: জ্ঞাননির্ভর পণ্য ও সেবা উৎপাদন (সফটওয়্যার, অ্যাপ্লিকেশন ইত্যাদি) বিতরণ এবং ভোগ; গ) গবেষণা ও উদ্ভাবন: গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেয়া এবং সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা; স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলা হবে। এখানে যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হবে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে। একটি উন্নত, আধুনিক ও উদ্ভাবনী বাংলাদেশ গঠনের মূল চালিকাশক্তি হবে প্রযুক্তি। স্মার্ট বাংলাদেশে শুধু অবকাঠামো, শাসন ব্যবস্থা, যোগাযোগ পদ্ধতি স্মার্ট হলেই চলবেনা, নাগরিকদেরও স্মার্ট হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক মাননীয় উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, “চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অংশ হিসেবেই নয়, জ্ঞানভিত্তিক শিল্প ও সেবা প্রদানের মাধ্যমেও বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে। অনুকরণ নয়, উদ্ভাবন করুন।” এখন প্রশ্ন হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পঞ্চগড়ের তরুণ-তরুণীদের কাজ কী হবে? আমরা কি শুধু অনুকরণ করবো? নিত্য নতুন আবিষ্কারের ভোক্তা হিসেবেই রয়ে যাবো নাকি আমরাও গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবো? আমরা বিশ্বাস করি আমাদের নতুন প্রজন্ম শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয় পুরো বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদের তুলে ধরবে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা, উদ্ভাবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা পঞ্চগড়বাসী এখনও পিছিয়ে আছি। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তা শ্রেণী সেভাবে আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এক্ষেত্রে আমরা আমাদের তরুণ-তরুণীরা যেন উদীয়মান প্রযুক্তি বিশেষ করে Artificial Intelligence, Robotics, Internet of Things, Augmented Reality, Virtual Reality, 3D Printing, Block Chain, Cyber Security, Nano Technology, Data Science, Big Data ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহী করে তুলবো এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবো। এছাড়া আমাদের তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির সাথে তাদের যুক্ত করার ব্যবস্থা করবো আমরা। ৬। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ: আমরা বরাবরই মানবিক পঞ্চগড়-এক গড়ে তোলার কথা বলছি। আমাদের স্বপ্নের মানবিক পঞ্চগড়ে প্রতিটি শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ-তরুণী এবং বয়স্ক প্রতিটি মানুষ শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্ত ও সবল থাকবেন। আর্থ-সামাজিক অবস্থা, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বয়স নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নে বিশ্বাস করি। মানুষের জন্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মানুষকে যুক্ত করতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সবল মানুষই পারেন সুস্থ ও সবল সমাজ এবং দেশ গড়তে। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার বিষয়টি অনেকটাই ব্যক্তির উপর নির্ভর করে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, শরীর চর্চা/ কায়িক পরিশ্রম করা ইত্যাদির মাধ্যমে খুব সহজেই যেকোনো বয়সের একজন মানুষ বছর জুড়েই সুস্থ থাকতে পারেন। পরিবারের একজন অসুস্থ হলে পুরো পরিবারকেই আর্থিক, মানসিক, শারীরিক ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। আমাদের এই অঞ্চলের বেশিরভাগ পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে সেই পরিবারের হাত খরচের টাকায় টান পড়ে। আমাদের বাস্তবতায় সবার জন্য স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করা এখনই সম্ভব নয় দেখে নিজেকেই চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয়। স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে আমরা অনেক বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রেহাই পেতে পারি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে বাংলাদেশ অসামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিদ্যমান প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা অবকাঠামো যেমন ১৪০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক, ৪০০০ ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার সেন্টার, ৫০০ উপজেলা হাসপাতালসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭৪ বছরের বেশি। অন্যান্য যেকোনো সময়ের চেয়ে দেশের মানুষের গড় আয়ু বেশি হলেও শারীরিক ও মানসিক নানা ধরনের অসুখের কারণে জীবনের পুরোটা সময় সুস্থ থাকতে পারেনা। শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষ কখনই সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন না। শারীরিক এবং মানসিক অসুস্থতার আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ের নেয়ার মত সঙ্গতি আমাদের নেই। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রকেই এই দায় বহন করতে হয়। স্বাস্থ্য বলতে এতদিন আমরা কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যকেই বুঝে আসছি। কখনো সচেতনভাবে, আবার কখনো অসচেতনতায় বিষয়টি ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৪৮ সালে ‘স্বাস্থ্য’–এর যে সংজ্ঞা দিয়েছিল, সেটি আজও প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘কেবল নিরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য।’ ফলে দীর্ঘদিন ধরে ‘স্বাস্থ্য’ শব্দটি সীমাবদ্ধ হয়ে ছিল ‘শারীরিক’ অংশটুকুর মধ্যে। তবে আশার কথা এই যে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেরিতে হলেও বাংলাদেশে ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ বিষয়টি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ধারায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার কোনো উপায় নেই, কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যসেবার ইতিহাসে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত ছিল। ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের আলোচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “বিশ্ব সভ্যতা বিকশিত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তর বৈষম্য ও নানাবিধ অসমতা রয়ে গেছে দেশে দেশে। এ অসমতা অর্থনৈতিক, সামাজিক এমনকি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও। স্বাস্থ্যের দিকে যদি তাকাই তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য আরও বেশি উপেক্ষিত। অথচ সুখী, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন মানবিক বিশ্ব গঠনে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।” শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও আমরা বিশেষভাবে নজর দিতে চাই। সে লক্ষ্যে আমাদের রয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। পর্যায়ক্রমে আমরা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে চাই। কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসকদের সহায়তায় স্থানীয় তরুণদের যুক্ত করে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা দিতে চাই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা ইত্যাদি বিষয়ে মানুষকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে চাই। মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয় নিয়ে শিক্ষিত মহলেও নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা চালু আছে। আমরা মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে সেই ধারণাগুলো বদলাতে চাই। ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আমরা আমাদের স্কুল কলেজগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সেমিনার বা ক্লাসের আয়োজন করবো। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসকদের জন্য আমরা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করবো। স্বল্প পরিসরে হলেও প্রশিক্ষণ পাওয়া এসব স্বাস্থ্যকর্মী মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে এবং সহায়তা করতে পারবে। ৭। আগামীর পঞ্চগড় হবে তারুণ্যনির্ভর: আমরা বিশ্বাস করি প্রতিটি তরুণ সম্ভাবনাময় এবং অনেক বড় কিছু করার ক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশের গৌরবের ইতিহাসের দিকে তাকালে এটি স্পষ্ট হতে পারে যে, যুগে যুগে সৎ ও মেধাবী তরুণরা দেশকে নানানভাবে এগিয়ে নিয়েছেন। তরুণদের নেতৃত্বে বাঙালির যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশে নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনও তরুণ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আমরা বিশ্বাস করি, সৎ এবং সৃজনশীল তরুণ প্রজন্মই আগামীর বাংলাদেশকে আরো উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে পারে। দেশ থেকে যাবতীয় বৈষম্য বিলোপ এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠনে সৎ ও যোগ্য তরুণদের নেতৃত্বের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। সমাজের কিছু অংশ মনে করেন, বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম অনেক আরামপ্রিয়, নিজকে নিয়ে ব্যস্ত, দেশ নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। এছাড়া মাদক, সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের মত ভয়ঙ্কর বিষয়ের সাথে তাড়া জড়িয়ে পড়ছে। আগামী দিনে তরুণরা সঠিকভাবে দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারবে কি না সে বিষয়ে তারা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মের কিছু বক্তব্য রয়েছে। তরুণ প্রজন্ম মনে করে, নীতি নির্ধারকগণ তরুণদের যথাযথভাবে কাজে লাগাচ্ছেন না, কারণ তারা তারুণ্যের শক্তিকে বিশ্বাস করেন না। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তরুণরা জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। আমরা মনে করি দুই দলের বক্তব্যই আংশিকভাবে সত্য। কিছু তরুণ-তরুণী হয়তো বিপথে গেছে আবার অনেকে আছে যারা সত্যিকার অর্থে সমাজের জন্য, দেশের জন্য কাজ করে চলেছে। ‘লেটস টক’ নামের এক অনুষ্ঠানে দেশের তরুণ প্রজন্ম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছে। দেশের বিভিন্ন পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীসহ প্রায় দেড়শ তরুণ-তরুণী দুর্নীতিমুক্ত, লিঙ্গবৈষম্যহীন এক উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের যে স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন তা একদিকে যেমন আশা জাগানিয়া, অপরদিকে দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অত্যন্ত জরুরি বলেও প্রতীয়মান হয়। তরুণ প্রজন্ম যে অসাধ সাধন করতে পারে সেটা আমরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। যথাযথ শিক্ষা ও সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা পঞ্চগড়ের সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাই। তরুণদের যোগ্যতা, মেধা, শিক্ষা এবং দক্ষতা অনুযায়ী আমরা তাদের যুক্ত করতে চাই। তরুণ প্রজন্মকে এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে আমরা কোনভাবেই আমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে পারবোনা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে তরুণদের রাষ্ট্রীয় বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত করা হয়েছে। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমরা তরুণদের পরিপূর্ণভাবে যুক্ত করতে চাই। সমাজ ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করা হলে এখন থেকেই তারা দেশের জন্য ভাববে আগামী দিনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে। আমরা এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই, যেখানে তরুণরাই অন্য তরুণদের বিপদ্গামী হবার হাত থেকে রক্ষা করবে। তরুণ প্রজন্মকে যদি আমরা সঠিক সময়ে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিতে পারি, তাদের ক্ষমতায়ন ঘটাতে পারি তবে এই প্রজন্ম যেমন ঠিক তেমনি আগামী প্রজন্মও লাভবান হবেন। তরুণরা কখন এগিয়ে আসবে সে আশায় বসে না থেকে আমরাই তরুণদের কাছে যেতে চাই, তাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতে চাই। ছাত্রলীগের কর্মী ও সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ সৃজনশীল, সৎ তরুণদের আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত এবং নন্দিত। আমাদের বিশ্বাস, পঞ্চগড়ও একদিন হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সকল অঞ্চলের জন্য আদর্শ এবং অনুকরণীয়। আর এই কাজটি হবে তরুণদের নেতৃত্বে। ৮। অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক পঞ্চগড় বিনির্মাণ: বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শনের মূল ভাবনাটি হচ্ছে সমাজের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষকে সর্বাধিক সুবিধা দিয়ে উন্নয়নের মূল ধারায় নিয়ে আসা। অনেকেই প্রশ্ন করেন বাংলাদেশের এই দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ম্যাজিক বা রহস্য কী? এর উত্তর খুঁজলে বর্তমান সরকারের নানা ইতিবাচক উদ্যোগের কথা সামনে চলে আসবে। তার মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নীতি কৌশল অন্যতম। এ নীতি শুধু দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে নয়, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করায় বড় অবদান রাখছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। আর্থিক প্রযুক্তির বর্ধিত ও বহুমাত্রিক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অন্তর্ক্তুক্তিমূলক উন্নয়ন সূচকে শক্ত অবস্থান তৈরিতে ভুমিকা রেখেছে। ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির কারণে অর্থব্যবস্থায় পদ্ধতিগত পরিবর্তন ঘটছে যা মূলত টেকসই উন্নয়নের অনুঘটক। মোবাইল ব্যাংকিং এর পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে চালু করা হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা। আজ কৃষক মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খুলতে পারছে। একতা সময় ছিল যখন গ্রামের একজন দরিদ্র মানুষ ব্যাংকে যাবার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। শেখ হাসিনার ‘বটম-আপ’ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টর আজ সমানভাবে এগিয়ে গেছে। আমাদের জাতীয় উন্নয়ন দর্শনের আলোকে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক পঞ্চগড়ে গড়ে তুলতে চাই। নারী, শিশু, বিশেষভাবে সক্ষম, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে চাই। শুধু অবকাঠামো গড়ে তুলেই নয় তাদের জন্য আমরা মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে চাই। উন্নয়নে তাদের অধিকার এবং অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে চাই আমরা। বিভিন্ন অবকাঠামোতে, রাস্তায়, পরিবহনে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে সেটি আমরা নিশ্চিত করতে চাই। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা সমাজের নিম্ন পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মানুষদের শিক্ষিত ও সচেতন করতে চাই। সমাজের একতা বা দুটা অংশ সচেতন হলেই পরিবর্তন হবে এটা আশা করা কঠিন। এ অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। কিন্তু তাদের রয়েছে নিরাপত্তাজনিত সংকট ও ভয়। এই সংকট ও সংশয় দূর করে আর্থিক ও সামাজিকভাবে তাদেরকে ক্ষমতায়িত করা আমাদের দায় ও দায়িত্ব। তাদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করেই আমরা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে সৃষ্টি করতে পারি নতুন কর্মসংস্থান। তারা যেন কখনই মনে না করেন তারা এই সমাজের বাইরের অংশ। সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ‘অপর’ হিসেবে রেখে টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ এবং সব ধরনের নির্যাতন যেকোনো উপায়ে আমরা বন্ধ করতে চাই। একটি সমাজ বা দেশ অনেক উন্নত, আধুনিক হতে পারে কিন্তু সেখানে যদি নারী ও শিশু নিরাপদ না হয় সেটাকে আমরা কখনই উন্নত বলতে পারিনা, মানবিক বলতে পারিনা। এসব বন্ধ করতে আমরা সমাজের সব অংশকে যুক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই। সেই সাথে নারীদের ছোট ছোট উদ্যোগের সাথে যুক্ত করে তাদের ক্ষমতায়নে সহায়তা করতে চাই আমরা। ক্ষমতায়িত নারীই বদলে দেবে পঞ্চগড়। নারীর জন্য নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা পঞ্চগড়কে ব্রান্ডিং করতে চাই- হিমালয় পাদদেশে শান্তিকন্যা পঞ্চগড় হিসেবে। আমাদের নৈতিকতার অবক্ষয়ের বিষময় চিত্র- খাদ্যে ভেজাল ও বিষ মিশ্রণ। এর ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শারীরিক ও মানসিকভাবে হুমকির সম্মুখীন। ভেজালদাতার পরিবারও এই ক্ষতির বাইরে নয়। যেকোনো মূল্যে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রয়োজনে ভেজাল প্রতিরাধে করবোই। এই সমস্যা সমাধানে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও সামাজিক প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। তাই পঞ্চগড়ের সমন্ত নাগরিকের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমি খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করতে চাই। বিষমুক্ত পঞ্চগড়ের পণ্য ব্রান্ডিং-এর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে এর বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব। গোটা উত্তরবঙ্গে বিশেষত সীমান্ত অঞ্চলে মাদকের হাতছানিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য তরুণ প্রাণ। পঞ্চগড়ও এর বাইরে নয়। মাদকাসক্তি সংক্রামক ব্যাধির মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। মাদকাসক্তরা পরিণত হয় পারিবারিক ও সামাজিক বোঝায়। এই সমস্যা সমাধানে পঞ্চগড়ের সচেতন নাগরিক এবং বিশেষভাবে আমি অভিভাবকদের সহযোগিতা চাই। যারা ভুল পথে যায়। অর্থাৎ মাদকাসক্ত তাদের প্রতি শাসন ও দরদের হাত বাড়িয়ে তাদেরকে সুপথে। ফিরিয়ে আনতে চাই। আর যারা ভুল পথে নেয় অর্থাৎ মাদক ব্যবসায়ী তাদের প্রতি জিরো টলারেন্স আচরণ দেখিয়ে কঠোর হাতে পঞ্চগড়ে মাদক ব্যবসা বন্ধ করতে চাই। সবাইকে নিয়ে সবার জন্য একটি মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বপ্নের পঞ্চগড় গড়ে তুলতে চলুন দল, মত নির্বিশেষে সকলে মিলে কাজ করি। ৯। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: পৃথিবীর প্রায় সবখানেই ছোট-মাঝারি এবং বড় নানান ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী বসবাস করে থাকে। জীববৈচিত্র্য বলতে সাধারণত আমরা বুঝে থাকি এসব উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাবেশকে। এসব উদ্ভিদ বা প্রাণীর মধ্যে প্রজাতিগত, জিনগত এবং বাস্তুতান্ত্রিক ভিন্নতা থাকতেই পারে। ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য থাকলেও এগুলো একটার সাথে আরেকটা যুক্ত বা নির্ভরশীল। উপাদানগুলো প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ, তাই কোন একটি উপাদান কমে গেলে বা ধ্বংস হলে সেটি পুরো সিস্টেমের উপর প্রভাব ফেলে। জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি, স্থানান্তর, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি জমির উপর চাপ, পানির প্রাপ্যতা ও সুষম বন্টন, বনাঞ্চল ক্ষয়, শিল্পায়ন ও পরিবহন খাতে ধারাবাহিক দূষণ ইত্যাদি কারণে সারা পৃথিবীতেই আজ জীব বৈচিত্র্য ঝুঁকির মুখে। তাই বলে দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত উন্নয়ন কাজ বন্ধ থাকতে পারেনা। দেশের উন্নয়নের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এরূপ সঠিক ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা এ উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি পরিণত, পূর্ণাঙ্গ করতে চাই। মনে রাখা উচিত, সব উন্নয়নের মূলে রয়েছে পরিবেশ। পরিবেশ বিনষ্ট করে বা তাকে অবজ্ঞা করে কোনো উন্নয়নই টেকসই, মানসম্পন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ হবে না। যে কারণে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি: অর্থনৈতিক মূল্য: মানুষ তার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধ প্রভৃতির জন্য সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। জীববৈচিত্র্যের জন্যেই মানুষ তার চাহিদা প্রকৃতি থেকে মেটাতে সক্ষম। নান্দনিক মূল্য: বিভিন্ন প্রজাতির জীব প্রকৃতিকে বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর করে তােলে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভােগ করতে প্রতিবছর হাজার হাজার অসংখ্য পর্যটক পঞ্চগড়ে ভ্রমণ করতে আসে। নৈতিক মূল্য: পৃথিবীতে প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। মানুষের কর্তব্য প্রতিটি জীবকে এই পৃথিবীর বুকে বাঁচিয়ে রাখা। পরিবেশ রক্ষা: প্রত্যেক জীব বাস্তুতান্ত্রিকভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। একটি জীবের বিনাশ অন্য কোনাে জীবের বিপন্নতার কারণ হতে পারে। তাই মানুষের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত হল এই জীববৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখা। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মানবিক উন্নয়নে বিশ্বাসী। তাঁর ভাবনায় মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখি ও অন্যান্য প্রাণী, গাছপালা, খাল-বিল, নদী-নালাসহ সমাজের প্রতিটি উপাদান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্য ভাল হলেই সে সমাজকে পরিপূর্ণ সমাজ বলা যেতে পারেনা। মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশু-পাখি, প্রাণী গাছ-পালা, নদী-নালা ইত্যাদি বিষয়ের দিকেও আমার লক্ষ্য রাখতে হবে। আমাদের এই অঞ্চলে একটি জনপ্রিয় পাখি হচ্ছে ‘শেখ ফরিদ’। এই পাখি সংরক্ষণ ও বংশ বিস্তারের জন্য আমরা অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে চাই। নদীর ধারে আমরা ফলজ গাছ রোপণ করতে চাই যেন এখান থেকে পাখপাখালি খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। প্রয়োজনে আমরা পাখির জন্য জলাধার তৈরি করবো। এমন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে পাখিপ্রেমী পর্যটক যেমন আসবে তেমনি ছবি তোলার জন্য দেশ বিদেশ থেকে আসবে ফটোগ্রাফার। আমরা আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় বিসর্জন না দিয়ে, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে চাই। ১০। নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে উদার ও অসাম্প্রদায়িক প্রজন্ম গড়ে তোলা: সংস্কৃতি মানুষের জীবনধারার প্রতিফলন। আমাদের ভাষা, চিন্তা, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, রীতিনীতি, রুচি, পেশা, ব্যবহার্য বস্তুগত উপাদান ইত্যাদিই আমাদের সংস্কৃতি। সমাজের মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়তই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের মধ্যে বেড়ে উঠি। আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ও আচরণের মাধ্যমে সেটি প্রতিফলিত হয়। হাজার হাজার বছর ধরে নানা নৃতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী ও শাখা-গোষ্ঠী, নানা শ্রেণির মিলন, পারস্পরিক প্রভাব এবং সমন্বয়ের ফলে আমাদের সংস্কৃতি আজকের রূপ পেয়েছে। আবহমানকালে থেকেই বাঙ্গালী সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বড়দের শ্রদ্ধা, ছোটদের স্নেহ, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সহনশীলতা, বিভিন্ন ধর্ম ও মতের শ্রদ্ধাশীল, সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়া, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানুষকে সম্মান করা ইত্যাদি। সংস্কৃতি প্রবাহমান নদীর মত, কালে কালে বিভিন্ন সংস্কৃতির সাথে মিশে নতুন নতুন অবয়ব ধারণ করে। এভাবেই সংস্কৃতি এগিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করছি, আমাদের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, বিচ্ছিন্নতা, প্রতিযোগিতা, অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা আমাদের ভাবাচ্ছে। নতুন চিন্তা, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও আবিষ্কারকে আমরা অবশই গ্রহণ করবো তবে অবশ্যই নিজস্বতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে নয়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে- ‘Think Global, Act Local’ অর্থাৎ আমাদের চিন্তার পরিসর হবে সারাবিশ্ব কিন্তু আমরা কাজ করবো স্থানীয়ভাবে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করছি আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এমনকি উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বিষয়টি কোনভাবেই আমাদের সংস্কৃতি সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষ যেন সম্প্রীতি নিয়ে বসবাস করতে পারে সেটিও আমাদের দেখতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা মানুষকে উদারতা শেখায়, সবার সঙ্গে মিশতে শেখায়, সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার মতো কাজে তাদেরকে উজ্জীবিত করে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন শুধু পড়া, পরীক্ষা, প্রতিযোগিতা ছাড়া যেন আর কিছুই নেই। একটা সময় ছিল তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংস্কৃতি চর্চা ছিল বাধ্যতামূলক। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত সংস্কৃতির নানা বিষয় যেমন নাটক, আবৃত্তি, সঙ্গীত, বিতর্ক, অভিনয় ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করতো। বিদ্যালয়ের পাঠাগারের বই পড়ার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাহিত্যচর্চার অভ্যাস গড়ে উঠত। বই পড়ার সংস্কৃতি নিজের মধ্যে গভীরতা তৈরি করে, ভাবতে শেখায়। অনেক সময় শোনা যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়না। আমরা কথা দিচ্ছি, স্কুল, কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমরা সংস্কৃতি চর্চা ফিরিয়ে আনবো। একজন উদার, দেশপ্রেমিক এবং মুক্তচিন্তার নাগরিক গড়ে তুলতে চাইলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প নেই। উপসংহার লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ আর লাল-সবুজ পতাকা। আমাদের রয়েছে গর্ব করার মত একটি সংবিধান। এই সংবিধান নিছক কোনো পুস্তক নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বপ্নপূরণ, তাদের চাহিদা আর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন আমাদের এই পবিত্র সংবিধান। এই আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে, বাংলাদেশ হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ। ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনায় ৪ টি মূলনীতির কথা বলা হয়েছিল। মূলনীতিগুলো হচ্ছে: (ক) জাতীয়তাবাদ: জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করে জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে। বাঙালি জাতির সেই ঐক্য ও সংহতি হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি; (খ) সমাজতন্ত্র: মানুষের উপর মানুষের শোষণের অবসান ঘটিয়ে ন্যায়ানুগ সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শোষণহীন সমাজ কায়েম করা হবে। সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করার লক্ষ্য ছিল মূলত মেহনতি মানুষকে সকল প্রকার শোষণ হতে মুক্তি দেয়া; (গ) গণতন্ত্র: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যেখানে মৌলিক মানবাধিকার, স্বাধীনতার নিশ্চয়তা এবং মানবসত্তার মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে। রাষ্ট্রীয় সকল কাজে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য; (ঘ) ধর্ম নিরপেক্ষতা: রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোন ধর্মের ব্যবহার, কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির বৈষম্য বা তার উপর উৎপীড়ন করা হবে না। মানুষ যাতে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারে এবং কেউ যাতে কারো ধর্ম-পালনে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। আমরা বিশ্বাস করি ৭২ সালের সংবিধানই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মূল রক্ষাকবচ যেখানে বাঙ্গালী জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। আমরা ৭২ সালের সংবিধানের ৪ মূলনীতি অনুযায়ী দেশ গড়তে চাই, আমাদের পঞ্চগড় গড়তে চাই। আপনাদের সামনে আমরা আজ যে আঞ্চলিক ইশতেহার উপস্থাপন করলাম সেটি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর সভানেত্রী এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন ও রূপকল্পের স্থানীয় সংস্করণ। আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনার মূল দর্শনের বিকল্প কিছু নয়, বরং ছায়া অবলম্বনে তৈরি স্থানীয় রূপকল্প। সরকারি উদ্যোগেই মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা শুধু স্থানীয় মানুষকে শিক্ষিত করে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবো। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ যাতে নিজেদের প্রয়োজন ও চাহিদা সম্পর্কে বলতে পারে, নীতি নির্ধারণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং সরকারের অবকাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থেকে সর্বচ্চোটা নিতে পারে সে বিষয়ে আমরা মানুষকে প্রস্তুত করতে চাই। অবকাঠামোভিত্তিক উন্নয়ন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আমরা গণকেন্দ্রিক উন্নয়নের পথে এগুতে চাই এবং মানবিক পঞ্চগড় গড়তে চাই। ডিজিটাল অর্থনীতি খাতে আমেরিকান উদ্যোক্তা Leila Janah বলেছেন, “ Talent is equally distributed but opportunity is not”। পঞ্চগড়েও রয়েছে অসংখ্য মেধাবী তরুণ তরুণী। সামান্য সুযোগ-সুবিধা পেলেই তারা অনেক বড় কিছু করার ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তরুণ-তরুণীদের জন্য বরাদ্দকৃত সুযোগ-সুবিধা যেন তারা ঠিকমত পেতে পারে সেটি নিশ্চিত করাই হবে অন্যতম কাজ। আমাদের স্বপ্নের মানবিক পঞ্চগড়ের যে ছবিটা আমরা আঁকতে চাচ্ছি সেখানে থাকবে শিশুকিশোর, তরুণ-তরুণীদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ, মানুষের দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ সুখী মানুষ, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো পরিতৃপ্ত কৃষক, বিশেষভাবে সক্ষম এবং পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বচ্চো সুযোগ-সুবিধাসহ এক অনন্য পঞ্চগড়। চলুন আমরা সকলে মিলে এই স্বপ্নটা বারবার দেখি। আমি আপনাদের পরিচিতি। আমি দূরের কেউ না। কারো ভাই, কারো সন্তান। এই পঞ্চগড়ের কাদা-জল-বাতাস খেয়েই আমি বড় হয়েছি। আমার, আপনার বা আমাদের সকলের গল্পগুলো কিন্তু একই রকম। আমরা খুব সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের রয়েছে অসাধারণ শক্তি আর অসাধারণ গল্প। চলুন আমরা আমাদের সেই অসাধারণ গল্পগুলোকে জোড়া দেই এবং একসাথে স্বপ্নের অনন্য পঞ্চগড় গড়ে তুলি। আমি পরিচিতি আপনাদের সাথেও আছি, পাশেও আছি। জয়বাংলা।

Get an Appointment

lorem Ipsum